গাজায় যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের নিচে শুধু ঘরবাড়ি চাপা পড়েনি, চাপা পড়েছে হাজারো পরিবারের আশা, স্বপ্ন আর স্বাভাবিক জীবন। ইসরায়েলি হামলার প্রায় তিন বছর পরও গাজার বহু পরিবার জানে না তাদের প্রিয়জনরা বেঁচে আছেন, নাকি ধ্বংসস্তূপের নিচে হারিয়ে গেছেন, নাকি কোনো অজানা কারাগারে বন্দী রয়েছেন। প্রতিদিন তারা একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন, “আমাদের মানুষটা কোথায়?” জীবিত না মৃত? সেই উত্তরও পাচ্ছে না হাজারো পরিবার।
কেউ নিখোঁজ হয়েছেন ইসরায়েলি স্থল অভিযানের সময়, কেউ বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে যাওয়ার পথে, কেউ আবার খাবার ও সাহায্যের সন্ধানে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। কেউ নিজের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখতে গিয়ে হারিয়ে গেছেন, কেউ সীমান্ত এলাকার কাছে নিখোঁজ হয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, তাদের পরিবারগুলো জানে না তারা অপেক্ষা করবে, নাকি শোক পালন শুরু করবে।
এটি শুধু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নয়; এটি এক ধরনের প্রতিদিনের মানসিক নির্যাতন। কারণ মৃত্যু অনেক সময় মানুষ মেনে নিতে পারে, কিন্তু অনিশ্চয়তা মেনে নেওয়া সবচেয়ে কঠিন। একজন মা জানেন না তার সন্তানকে মৃত ধরে কাঁদবেন, নাকি দরজার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করবেন। একজন স্ত্রী জানেন না তার স্বামী আর কখনো ফিরবেন না, নাকি কোনো একদিন হঠাৎ ফিরে আসবেন।

ফিলিস্তিনের স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় এখনো ১১ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা মানুষ এবং জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিরা।
ফিলিস্তিনি নিখোঁজ ও জোরপূর্বক গুম কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এবং ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চলাকালীন সময়েও প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তারা নিখোঁজ হয়েছেন অথবা পরিবারের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ হারিয়েছেন।
সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা হলো, অনেক পরিবারের কাছে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গাজা থেকে আটক করা অনেক মানুষের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করেনি। একই সঙ্গে গাজায় ফেরত পাঠানো প্রায় ৬২০টি মৃতদেহ এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এই অনিশ্চয়তা গাজার পরিবারগুলোর জীবনে প্রতিদিনের এক অসহনীয় যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। তারা জানেন না তাদের স্বজনরা জীবিত আছেন কি না, কোনো কারাগারে আটক আছেন কি না, নাকি ধ্বংসস্তূপের নিচে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছেন।
৩২ বছর বয়সী সাংবাদিক নিদাল আল-ওয়াহিদী নিখোঁজ হওয়ার পর তিন বছর ধরে তার পরিবার শুধু একটি খবরের অপেক্ষায় রয়েছে।
মধ্য গাজা শহরের আল-নাফাক সড়কের একটি ছোট তাঁবুর ভেতরে নিদালের বাবা-মা এখনো মোবাইলে ছেলের ছবি দেখেন। বোমা হামলায় তাদের বাড়ি ধ্বংস হয়েছে, ছেলের স্মৃতিচিহ্নও হারিয়ে গেছে। এখন শুধু কিছু ছবি আর স্মৃতিই তাদের কাছে অবশিষ্ট।
নিদালের বাবা ৬২ বছর বয়সী সুহাইল আল-ওয়াহিদী বলেন, “তার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকা আর অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই।”
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ভোররাতে নিদাল নিখোঁজ হন। ইসরায়েলি চেকপয়েন্টে হামাসের হামলার পর তিনি উত্তর গাজার এরেজ ক্রসিংয়ের ঘটনা কাভার করতে সহকর্মীদের সঙ্গে বের হয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছানোর কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
তার বাবা বলেন, “তিন বছর ধরে আমরা শুধু আমাদের ছেলের কোনো খবরের জন্য অপেক্ষা করে আছি।”

পরিবারটি রেড ক্রসসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু কোনো সংস্থাই তাদের নিদালের ভাগ্য সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
সুহাইল আল-ওয়াহিদীর সবচেয়ে বড় কষ্ট শুধু ছেলেকে হারানো নয়; বরং তিনি জানেন না ছেলের জন্য কাঁদবেন, নাকি তার ফিরে আসার আশা ধরে রাখবেন।
তিনি বলেন, “নিদাল শুধু আমাদের ছেলে ছিল না। সে ছিল আমাদের বন্ধু, আমাদের পরিবারের মেরুদণ্ড, আমার ডান হাত। এখন প্রতিটি মুহূর্তে তার অভাব অনুভব করি।”
সাঈদ হাজ্জাজ (৫৯) এবং তার ছেলে কাসেম হাজ্জাজ (১৭)—দুই বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ। তাদের পরিবার এখনো বিশ্বাস করে, তারা হয়তো একদিন ফিরে আসবেন।
২০২৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর তাদের সঙ্গে পরিবারের শেষ যোগাযোগ হয়। উত্তর গাজার শেখ রাদওয়ানে থাকার সময় ইসরায়েলি অভিযানের মধ্যে তারা আটকা পড়েন।
ইসরায়েলি বাহিনী অভিযান চালানোর পর বাড়িঘর ধ্বংস করা হয়। নারীদের দক্ষিণ গাজায় চলে যেতে বাধ্য করা হয় এবং পুরুষদের আটক করা হয়।
সাঈদের মেয়ে নিসরিন হাজ্জাজ বলেন, “শেষবার যখন আমরা আমার বাবা ও ভাইকে দেখেছিলাম, তখন তারা নগ্ন, হাতকড়া পরা অবস্থায় নির্যাতিত ও অপমানিত হচ্ছিলেন। এরপর থেকে আমরা আর কিছুই জানি না।”
এই অনিশ্চয়তা পুরো পরিবারকে ভেঙে দিয়েছে। সাঈদের স্ত্রী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। দিনের পর দিন কান্না করতে করতে তার শারীরিক অবস্থাও খারাপ হয়েছে।
নিসরিন বলেন, “তারা এখনো আমাদের জীবনের অংশ। কিন্তু আমরা জানি না তাদের জন্য শোক করব, নাকি অপেক্ষা করব।”
পরিবারটি মৃত্যুসনদ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কারণ তাদের বিশ্বাস, যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিত প্রমাণ না পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ তাদের প্রিয়জন হয়তো জীবিত আছেন।
নিসরিন বলেন, “আমার বাবা তার প্রথম নাতি বা নাতনিকে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন। দাদা হওয়া ছিল তার স্বপ্ন। কিন্তু সেই মুহূর্তে তিনি ছিলেন না।”

মোহাম্মদ মাজেন আবু শাবান নিখোঁজ হওয়ার পর তার ভাই আলা আবু শাবান প্রতিদিন একটি ছবি হাতে নিয়ে মানুষের কাছে জানতে চান—কেউ কি তাকে দেখেছে?
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মোহাম্মদ নিজের বাড়ি ছেড়ে যেতে চাননি। তিনি বলেছিলেন, “শিগগিরই সব শেষ হয়ে যাবে, বাড়ি খালি রেখে যাওয়ার কোনো মানে নেই।”
সেদিনই ছিল পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথা।
দুই মাস পর এক আত্মীয় তার ফোনে একটি বার্তা পান। সেখানে মোহাম্মদ জানান, তিনি দেইর আল-বালাহের কাছে ইসরায়েলের অভ্যন্তরের কিসুফিম এলাকায় আছেন এবং পরিবারকে তাকে নিতে আসতে বলেন। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে পরিবার সেখানে যেতে পারেনি।

এরপর থেকে তার আর কোনো নিশ্চিত খবর নেই।
আলা বলেন, “তিন বছর ধরে আমরা জানি না আমার ভাইয়ের কী হয়েছে। সে কোথায় আছে, বেঁচে আছে কি না- কিছুই জানি না।”
কিছু মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দী জানিয়েছেন, তারা ওফার কারাগারে মোহাম্মদের নাম শুনেছেন। কিন্তু কোনো মানবাধিকার সংস্থা এখনো তার ভাগ্য নিশ্চিত করতে পারেনি।
আলার সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো, তার ভাইয়ের সন্তানরা প্রতিদিন প্রশ্ন করে, “আমাদের বাবা কোথায়? তিনি কবে ফিরে আসবেন?”
তিনি বলেন, “অনেক রাতে আমি কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ি। আমি আমার ভাইকে খুব মিস করি। সবচেয়ে কষ্ট হয় এই ভেবে যে, তার বড় ছেলে নিহত হয়েছে এবং বাবা না থাকায় আমরা তাকে রক্ষা করতে পারিনি।”
গাজার যুদ্ধ শুধু মানুষের জীবন কেড়ে নেয়নি, এটি হাজারো পরিবারকে এক অনন্ত অপেক্ষার মধ্যে আটকে দিয়েছে। যারা মারা গেছেন, তাদের পরিবার অন্তত জানে কী ঘটেছে। কিন্তু যারা নিখোঁজ, তাদের পরিবার প্রতিদিন একই যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়- আশা আর হতাশার মাঝখানে দাঁড়িয়ে।

তারা জানে না দরজায় কড়া নাড়া মানুষটি তাদের প্রিয়জন হবে কি না। তারা জানে না ফোনে আসা একটি অজানা নম্বর হয়তো তাদের জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত খবর নিয়ে আসবে কি না।
গাজার এই পরিবারগুলোর জন্য যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। কারণ তাদের যুদ্ধ শুধু বোমা ও ধ্বংসের বিরুদ্ধে নয়; তাদের যুদ্ধ অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে, অপেক্ষার বিরুদ্ধে, আর সেই প্রশ্নের বিরুদ্ধে- “আমাদের প্রিয় মানুষগুলো কোথায়?”
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনের আলোকে প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছে।

