ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর ক্রামাতোরস্কে দুটি বাসে হামলার ঘটনায় ৩০ জন নিহত হয়েছেন। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, রাশিয়ার হামলায় এসব বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এটিকে অন্যতম ভয়াবহ প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার ক্রামাতোরস্ক শহরে চলাচলকারী দুটি বাসে এই হামলা হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার পর বাস দুটি আগুনে পুড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, ধ্বংসপ্রাপ্ত বাসের ধাতব কাঠামো পড়ে রয়েছে এবং আশপাশে ছড়িয়ে আছে ধ্বংসাবশেষ।
ইউক্রেনের পুলিশ জানিয়েছে, বাসগুলোতে গ্লাইড বোমা ব্যবহার করে আঘাত করা হয়েছে। তবে হামলার বিষয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডোনেৎস্ক অঞ্চলের গভর্নর ভাদিম ফিলাশকিন অভিযোগ করেছেন, রুশ বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। তার দাবি, এই হামলা যুদ্ধের আন্তর্জাতিক নিয়ম ও মানবিক আইনের নীতির বিরোধী।
ক্রামাতোরস্ক সিটি কাউন্সিলও ঘটনাটিকে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ভয়াবহ হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের ভাষ্য, হামলার স্থানটিতে কোনো সামরিক স্থাপনা বা লক্ষ্যবস্তু ছিল না।
এই হামলার মাত্র এক দিন আগে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলের চেরনিহিভ অঞ্চলের প্রিলুকি শহরে একটি আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২২ জন নিহত হন। ইউক্রেন জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে পাঁচটি শিশুও ছিল।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরু থেকে ইউক্রেনে ১৭ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এর আগে অভিযোগ করেছিলেন, রুশ নেতৃত্ব বেসামরিক এলাকায় বড় ধরনের হামলার অনুমোদন দিয়েছে। তবে রাশিয়ার সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এদিকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভেও সাম্প্রতিক সময়ে হামলার চাপ বেড়েছে। বুধবার রাশিয়ার পক্ষ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে ইউক্রেন জানিয়েছে। কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিৎসকো জানান, একটি ড্রোন হামলায় শহরের সোলোমিয়ানস্কি এলাকায় একটি ভবনে আগুন লাগে এবং সেখানে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম দিকে কিয়েভ তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীও নিয়মিত হামলার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা, রেল নেটওয়ার্ক এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেন।
ক্রামাতোরস্ক শহরটি ডোনেৎস্ক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। যুদ্ধ শুরুর আগে এখানে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করতেন। বর্তমানে এটি ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে বিবেচিত হয়।
শহরটি ইউক্রেনীয় বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ও যোগাযোগ কেন্দ্র। রুশ বাহিনী শহরের কাছাকাছি অবস্থান নেওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
হামলার পর ক্রামাতোরস্ক ও পাশের স্লোভিয়ানস্ক শহরে গণপরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গভর্নর ফিলাশকিন জানিয়েছেন, যাত্রী ও চালকদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে পরিবহন চালু রাখা সম্ভব নয়।
এদিকে ইউক্রেন গত মাসে লিমান অঞ্চলের কাছে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে বলে জানিয়েছে। কিছু এলাকায় অগ্রগতি অর্জনের দাবি করেছে কিয়েভ। তবে একই সময়ে পূর্বাঞ্চলে রুশ সামরিক চাপও অব্যাহত রয়েছে।
ক্রামাতোরস্কে বাসে হামলার ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সামরিক সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক উদ্বেগের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠছে।

