ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাত আবারও বড় আকার নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হওয়ার পর সৌদি আরব ‘কঠোরভাবে’ প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলাকে ‘ভয়াবহ’ বলে অভিহিত করেছেন। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট এই হামলার জন্য ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে এবং এটিকে একটি “পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ” হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে হুথিরা এখনো এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।
২০২২ সাল থেকে কার্যকর থাকা জাতিসংঘ-মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর হুথি ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা শুধু সৌদি-ইয়েমেন সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা: কী ঘটেছিল?
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত ১২ জন নিহত এবং আরও ৩০৯ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক, দুজন বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও সুদানের একজন করে নাগরিক ছিলেন।
এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবের ওপর এটিই ছিল অন্যতম প্রাণঘাতী হামলা।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি এক বিবৃতিতে বলেন, “সন্ত্রাসী হুথি মিলিশিয়ার এই কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী হামলা, যার ফলে বেসামরিক যাত্রী ও বিমানবন্দর কর্মীদের মধ্যে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তা একটি পুরোদস্তুর যুদ্ধাপরাধ।”
হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল করা হয় অথবা অন্য পথে পাঠানো হয়। রিয়াদের স্কুলগুলোতেও এক সপ্তাহের জন্য দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে পাঠদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, দেশটির পূর্বাঞ্চলে দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও একটি ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়ে।
হুথিদের পাল্টা বার্তা ও সৌদি নিরাপত্তা উদ্বেগ
যদিও হুথিরা রিয়াদ বিমানবন্দরের হামলার দায় স্বীকার করেনি, তারা সৌদি বিমানবন্দর ব্যবহার না করার জন্য বিমান সংস্থা, কর্মী ও যাত্রীদের সতর্ক করেছে।
হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, সৌদি বিমানবন্দর ও আকাশসীমা “লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে” এবং সবাইকে তাদের সতর্কবার্তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত।
হুথিদের এই অবস্থান দেখাচ্ছে যে, তারা শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরে নয়, বরং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
সানা থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক ইউসুফ মাউরি বলেন, হুথিরা সৌদি আরবের “সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ”—আরামকোর তেল স্থাপনা এবং রিয়াদের বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে প্রতিশোধ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, সৌদি আরব প্রতিশোধের কথা বললেও মনে রাখতে হবে, ইয়েমেনজুড়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বহু বিমান হামলা হয়েছে এবং হুথিরা এখনো সৌদি ভূখণ্ডে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে।
হুথিরা কেন সৌদি স্থাপনাকে লক্ষ্য করছে?
ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী গত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি এবং তেল অবকাঠামো।
সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জাজানের কিং আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আজিজ বিমানবন্দর এবং নাজরান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় তিনজন আহত হন এবং ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এছাড়া আভা বিমানবন্দর ও রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় তিনজন নিহত এবং ৩৬ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
হুথিরা আরও দাবি করেছে, তারা লোহিত সাগর উপকূলের রাবিগে অবস্থিত আরামকোর তেল শোধনাগারকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে লক্ষ্য করেছে এবং সেখানে আগুন লেগেছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ এই দাবি নিশ্চিত করেনি।
ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন উত্তেজনা
সর্বশেষ সংঘাত শুধু সৌদি ভূখণ্ডে হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইয়েমেনের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রেও লড়াই তীব্র হয়েছে।
সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী ৪ অক্টোবর হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান শুরু করেছে। এর লক্ষ্য ছিল কৌশলগত বন্দরনগরী মোচা এবং মায়ুন দ্বীপসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পুনর্দখল করা।
সরকারি বাহিনী দাবি করেছে, তারা মোচা ও ধুবাব জেলা পুনরুদ্ধার করেছে। তবে হুথিরা এই দাবি অস্বীকার করেছে।
এদিকে তাইজ শহরকে ঘিরেও সংঘাত বেড়েছে। হুথিরা তাইজের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে মারিব ও আল-জাওফ অঞ্চলেও নতুন করে লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক অভিযানে প্রায় ২ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে এবং অন্তত ১ হাজার ১৫০ জন হুথি যোদ্ধা নিহত হয়েছে। তবে আল জাজিরা এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: যুক্তরাষ্ট্র কি সরাসরি যুক্ত হবে?
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, এই হামলা নিরীহ বেসামরিক মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞার পরিচায়ক এবং এটি বন্ধ হওয়া উচিত।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোর ওপর হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি এবং কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই হামলাকে “জঘন্য” বলে অভিহিত করেছেন এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি ইসলামাবাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
এর আগে ৫ অক্টোবর তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয় এবং ইয়েমেনের হুথি হামলা মোকাবিলায় সহযোগিতার বিষয় সামনে আসে।
যুক্তরাষ্ট্র কি আবার ইয়েমেন যুদ্ধে ফিরবে?
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তিনি হামলাকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে উল্লেখ করেছেন এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সরাসরি সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়নি। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে সৌদিকে গোয়েন্দা তথ্য, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং সামরিক পরিকল্পনায় সহায়তা করছে।
২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেন যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করলে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য, অস্ত্র ও রসদ সহায়তা দিয়েছিল। তবে বাইডেন প্রশাসন ২০২১ সালে মানবিক সংকটের কারণ দেখিয়ে সৌদি অভিযানে সরাসরি সমর্থন কমিয়ে দেয়।
ইয়েমেন কি বড় আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে যাচ্ছে?
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, ইয়েমেনের সংঘাত এখন আর শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারেনি। বর্তমানে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা, সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে ইয়েমেন আবার বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের সমাধান সামরিক শক্তির মাধ্যমে নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং একটি টেকসই শান্তি প্রক্রিয়া। কারণ ইয়েমেনের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ, যারা দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত, ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে।

