কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফাইভ-জি, স্মার্ট প্রযুক্তি আর ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে পৃথিবী যখন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখনও বিশ্বের একটি দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরে বিদ্যুতের আলো পান না। দেশটির নাম চাদ, মধ্য আফ্রিকার একটি স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। ২০২৬ সালেও দেশটির মানুষের বড় একটি অংশের কাছে বিদ্যুৎ কোনো স্বাভাবিক নাগরিক সুবিধা নয়, বরং অধরা এক প্রত্যাশা।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ২০২৪ সালের উপাত্ত অনুযায়ী, চাদের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ-সুবিধার বাইরে। এই পরিসংখ্যান দেশটিকে বিশ্বের সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ-সুবিধাপ্রাপ্ত দেশগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
বিদ্যুৎ নেই, জীবনের সুযোগও সীমিত
বিদ্যুৎ শুধু ঘর আলোকিত করার উপকরণ নয়; আধুনিক জীবনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেবাকর সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছাড়া বিদ্যালয়ে ডিজিটাল শিক্ষা, হাসপাতালের আধুনিক চিকিৎসা, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, ক্ষুদ্র ব্যবসার বিকাশ এবং ইন্টারনেটভিত্তিক কর্মসংস্থান গড়ে তোলা কঠিন।
চাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুতের সীমিত প্রাপ্যতা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে। সন্ধ্যার পর পড়াশোনা, খাবার সংরক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখা কিংবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চালানোর মতো মৌলিক কাজও অনেক ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য বিকল্প জ্বালানির ব্যয় বহন করা কঠিন। ফলে বিদ্যুৎহীনতা কেবল অন্ধকারে থাকার সমস্যা নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আয় ও জীবনমানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
গ্রামাঞ্চলে সংকট আরও গভীর
চাদের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে। বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে বসতি ছড়িয়ে থাকা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং সংযোগ স্থাপনের ব্যয় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর কাজকে কঠিন করে তুলেছে।
জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ-সুবিধার হার কম হওয়ায় শহর ও গ্রামের মানুষের সুযোগের ব্যবধানও উদ্বেগের বিষয়। যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ বা অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থার অভাবে পরিবারগুলোকে অন্ধকারের ওপর নির্ভর করেই রাত কাটাতে হয়।
তবে গ্রামাঞ্চলের ঠিক কত শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ-সুবিধার বাইরে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট বছরের নির্ভরযোগ্য উপাত্ত ছাড়া কোনো একক পরিসংখ্যানকে চূড়ান্ত হিসেবে ধরেটচপ নেওয়া উচিত নয়।

কেন এত পিছিয়ে চাদ?
চাদের বিদ্যুৎ-সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সাহারা মরুভূমির তীব্র শুষ্কতা আর চরম ভাবাপন্ন জলবায়ুর কারণে চাদকে বলা হয় Dead Heart of Africa বা আফ্রিকার মৃত হৃদয়। আর এই ভৌগোলিক রুক্ষতার সাথে যোগ হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা, যা দেশটিকে আধুনিক বিশ্বটচ থেকে অনেক বেশি পিছিয়ে রেখেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, সীমিত বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত বিদ্যুৎ মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার মতো সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
অর্থাৎ, সমস্যা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নয়; বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা—সবকিছুর সঙ্গে এই সংকট জড়িত।
প্রযুক্তির বিশ্বে বৈষম্যের নির্মম চিত্র
বিশ্বের এক প্রান্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে, অন্য প্রান্তে কোটি মানুষ এখনোফ বিদ্যুতের মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এই বৈপরীত্য দেখিয়ে দেয়, প্রযুক্তির অগ্রগতি আর মানবজাতির সবার সমান অগ্রগতি এক বিষয় নয়।
বিদ্যুৎ না থাকলে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়। অনলাইন শিক্ষা, দূরবর্তী চিকিৎসাসেবা, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং ইন্টারনেটভিত্তিক কর্মসংস্থানে প্রবেশাধিকারও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে বিদ্যুৎ-সংকট বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও গভীর করতে পারে।
সমাধান কোথায়?
চাদের বিদ্যুৎ-সংকট মোকাবিলায় শুধু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ, ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের সুবিধা এবং সাশ্রয়ী সংযোগ সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা, স্বচ্ছ বিনিয়োগ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতাও এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের উপাত্তে চাদের বিদ্যুৎ-সুবিধার হার ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ—অর্থাৎ, অগ্রগতির কিছু চিহ্ন থাকলেও ব্যবধানটি এখনো বিশাল।
*চাদের বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি শুধু কত উন্নত প্রযুক্তি তৈরি হলো, তা নয়; বরং সেই প্রযুক্তির সুফল কত মানুষের কাছে পৌঁছাল। পৃথিবী যখন ভবিষ্যতের জীবন নিয়ে পরিকল্পনা করছে, তখনো কোটি মানুষের কাছে বিদ্যুতের আলো পৌঁছানোই যদি অনিশ্চিত থাকে, তবে বৈশ্বিক উন্নয়নের গল্পটি এখনো অসম্পূর্ণ*।

