বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে যুদ্ধের ময়দানে যে দেশ নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে, সেই দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়েই আলোচনা হতে পারে তাকে ছাড়াই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় বৈঠক ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটিই।
আগামী ১৮–১৯ নভেম্বর চীনের শেনজেনে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন বা এপেক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই সম্মেলনের ফাঁকে তিন নেতার বৈঠক হলে আলোচনায় আসতে পারে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং ইউক্রেন যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো, ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হবে, অথচ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সেই আলোচনায় থাকবেন না, এমন ব্যবস্থা কতটা গ্রহণযোগ্য?
প্রস্তাবিত বৈঠক এখনো চূড়ান্ত না হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি করেছে। রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প বৈঠকে আগ্রহ দেখিয়েছেন, তবে তাঁর ঘোষিত প্রধান লক্ষ্য পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ।
তিন নেতার তিন হিসাব: কে কী অর্জন করতে চায়?
এই বৈঠকের সম্ভাব্যতা বুঝতে হলে তিন নেতার নিজস্ব স্বার্থগুলো আলাদা করে দেখতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নিরাপত্তা, চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশ্ন। তিনি যদি পুতিন ও শি জিনপিংকে একই টেবিলে আনতে পারেন, তাহলে সেটিকে নিজের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কোনো সমঝোতা হলে তার আন্তর্জাতিক গুরুত্ব থাকবে। কিন্তু কেবল তিন নেতাকে এক জায়গায় বসাতে পারা আর কার্যকর চুক্তি অর্জন করা এক বিষয় নয়। আলোচনার টেবিলে ছবি তোলা সহজ; পরস্পরবিরোধী স্বার্থের মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা অনেক কঠিন।

পুতিনের হিসাব আবার আলাদা। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ এবং ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিরোধের মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক রাশিয়াকে কূটনৈতিকভাবে আরও গ্রহণযোগ্য অবস্থানে তুলে ধরতে পারে। পাশাপাশি, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা হলে মস্কো এমন শর্ত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে, যা রাশিয়ার সামরিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে যাবে। তবে পুতিন ঠিক কী শর্ত চাইবেন, তা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রকাশ্য তথ্য নেই। এই জায়গায় মূল বিষয় হলো, রাশিয়া শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান ধরে রাখতে চায় না; আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিজের শর্ত প্রতিষ্ঠার সুযোগও খুঁজছে।
শি জিনপিংয়ের জন্য সম্ভাব্য বৈঠকটি আরও সূক্ষ্ম কূটনৈতিক হিসাবের বিষয়। চীনের মাটিতে বিশ্বের দুই গুরুত্বপূর্ণ শক্তির নেতাকে একত্র করা গেলে বেইজিং নিজেকে শুধু অর্থনৈতিক পরাশক্তি নয়, আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেও তুলে ধরতে পারবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চীন নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে চাইবে। কিন্তু এখানেও ঝুঁকি রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের মতো একটি সংঘাত নিয়ে ইউক্রেনকে বাদ দিয়ে সমঝোতার চেষ্টা হলে চীনকে এমন একটি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হতে পারে, যেখানে ছোট বা আক্রান্ত রাষ্ট্রের মতামতের চেয়ে বড় শক্তিগুলোর স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
চীনের মাটিতে বৈঠক: বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্র কি বদলাচ্ছে?
শেনজেনে সম্ভাব্য এই বৈঠকের প্রতীকী গুরুত্বও কম নয়। একসময় বিশ্বরাজনীতির বড় সিদ্ধান্তের কেন্দ্র ছিল ওয়াশিংটন ও মস্কো। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করত। ১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের চীন সফর এবং হেনরি কিসিঞ্জারের কূটনৈতিক উদ্যোগ সেই সমীকরণে বড় পরিবর্তন এনেছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্র চীন-সোভিয়েত বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে মস্কোর ওপর কৌশলগত চাপ বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল। আজ পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। চীন এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি, রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান প্রভাবশালী শক্তি।
এখানেই বর্তমান পরিস্থিতির তাৎপর্য। যদি শেনজেনে তিন নেতার বৈঠক হয়, তাহলে আলোচনার স্থান এবং আয়োজক হিসেবে চীন স্বাভাবিকভাবেই কূটনৈতিক গুরুত্ব পাবে। তবে শুধু চীনের মাটিতে বৈঠক হচ্ছে বলেই বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্র পুরোপুরি বেইজিংয়ে সরে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, আন্তর্জাতিক ক্ষমতার হিসাব এখন আগের চেয়ে বহুমুখী হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও সামরিক, অর্থনৈতিক ও আর্থিক শক্তির দিক থেকে অত্যন্ত প্রভাবশালী; চীনও প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও উৎপাদনব্যবস্থায় নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। রাশিয়া আবার সামরিক শক্তি, জ্বালানি সম্পদ এবং পারমাণবিক সক্ষমতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এই তিন শক্তির পারস্পরিক দরকষাকষি তাই বিশ্বরাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ: আলোচনার সবচেয়ে বাস্তব কারণ
বৈঠকের সম্ভাব্য আলোচ্যসূচিতে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দেওয়ার পেছনে বাস্তব কারণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র সীমিত করার সর্বশেষ বড় দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নিউ স্টার্টের মেয়াদ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়েছে। বিকল্প কোনো চুক্তি না থাকায় দুই দেশের পারমাণবিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (SIPRI) ২০২৬ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিশ্বে আনুমানিক ১২ হাজার ১৮৭টি পারমাণবিক ওয়ারহেড ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৭৪৫টি সামরিক মজুতে ছিল, অর্থাৎ সম্ভাব্য ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে রয়েছে বিশ্বের সামরিক মজুতে থাকা পারমাণবিক ওয়ারহেডের প্রায় ৮৩ শতাংশ।
চীনের পারমাণবিক মজুত তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও তা দ্রুত বাড়ছে। সিপ্রি (SIPRI)-এর হিসাব অনুযায়ী, দেশটির হাতে আনুমানিক ৬২০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। ওয়াশিংটন নতুন পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী। কিন্তু বেইজিংয়ের যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক মজুতের সঙ্গে চীনের মজুতের বড় পার্থক্য থাকায় তিন দেশের জন্য একই ধরনের সীমা নির্ধারণ ন্যায্য হবে না। ফলে তিন নেতার বৈঠক হলেও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ঐকমত্য তৈরি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবু আলোচনা শুরু করা জরুরি, কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী পারমাণবিক শক্তিগুলোর মধ্যে যোগাযোগ কমে গেলে ভুল হিসাব, ভুল সংকেত কিংবা সামরিক উত্তেজনা থেকে বড় বিপর্যয় ঘটার ঝুঁকি বাড়ে।
ইউক্রেনকে বাদ দিলে শান্তি, নাকি নতুন সংকট?
এই সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ইউক্রেনকে ঘিরেই। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসনের পর থেকে ইউক্রেনের ভূখণ্ড, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা চলছে। যুদ্ধে ইউক্রেনের মানুষ নিহত হয়েছে, শহর ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন আলোচনা করতে পারে, কিন্তু ইউক্রেনের নিজের অবস্থানকে উপেক্ষা করতে পারে- এমন ধারণা আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি মৌলিক নীতিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।
জেলেনস্কি ২০ অক্টোবর বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার নেতারা বৈঠক করতে পারেন, কিন্তু ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হলে ইউক্রেনকেও আলোচনার টেবিলে থাকতে হবে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, ইউক্রেনকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ইউক্রেনের অংশগ্রহণ ছাড়া অন্যদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যম Ukrainska Pravda-তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর এই অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।

এখানে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। ১৯৪৫ সালের ইয়াল্টা সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারা যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের নানা প্রশ্নে আলোচনা করেছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সম্মেলনের সরাসরি তুলনা করা যায় না, কারণ সময়, আন্তর্জাতিক আইন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা। কিন্তু ইয়াল্টার উদাহরণ একটি প্রশ্ন সামনে আনে: বড় শক্তিগুলো যখন অন্য রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেই রাষ্ট্রের জনগণের মতামত ও রাজনৈতিক অধিকার কতটা গুরুত্ব পায়? ইউক্রেনকে বাদ দিয়ে কোনো সমঝোতার চেষ্টা হলে এই প্রশ্ন আরও জোরালো হবে।
শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কখনো কখনো কঠিন আপসের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আপস আর চাপিয়ে দেওয়া সমাধান এক নয়। ইউক্রেনের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানকে উপেক্ষা করে কোনো চুক্তি হলে তা হয়তো সাময়িকভাবে যুদ্ধ থামাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নতুন অসন্তোষ ও সংঘাতের বীজ রেখে যেতে পারে। অন্যদিকে ইউক্রেনসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অংশগ্রহণে আলোচনা হলে সমঝোতার বাস্তবতা ও স্থায়িত্ব বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
জ্বালানি, নিষেধাজ্ঞা ও কূটনীতির লেনদেন
এই সম্ভাব্য বৈঠকের পটভূমিতে রুশ ডিজেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ। ৯ অক্টোবর মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর রাশিয়ায় উৎপাদিত ডিজেল জ্বালানির বিক্রি, সরবরাহ, খালাস ও আমদানিসংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট লেনদেন অনুমোদন করে একটি সাধারণ লাইসেন্স জারি করেছে। লাইসেন্সটি ২০২৭ সালের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরকারি নথিতে এ তথ্য রয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্প ও পুতিনের ফোনালাপ এবং সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় জ্বালানি, নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক দরকষাকষির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে এখানে সতর্ক থাকা দরকার। নির্দিষ্ট জ্বালানি লেনদেনের অনুমতি দেওয়া মানেই রাশিয়ার ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া নয়; একইভাবে এই সিদ্ধান্তকে কোনো গোপন রাজনৈতিক চুক্তির প্রমাণ হিসেবেও দেখানো যায় না। বরং বিষয়টি দেখায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জ্বালানি শুধু অর্থনৈতিক পণ্য নয়, কূটনৈতিক দরকষাকষিরও একটি উপাদান। জ্বালানির দাম, সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব হিসাব রয়েছে। রাশিয়াও তার জ্বালানি রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে চায়। দুই পক্ষের স্বার্থ যেখানে মিলে যায়, সেখানে সীমিত সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে- যদিও অন্য বিষয়ে তাদের বিরোধ অব্যাহত থাকে।
![Putin's Message: Things Are Still Under [My] Control](https://news.virginia.edu/sites/default/files/Header_NA_PutinRussia_EFM.jpg)
শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থ রক্ষা পাবে?
সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় বৈঠককে তাই একদিকে শান্তি ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হিসেবে দেখা যায়, অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর নিজস্ব স্বার্থের দরকষাকষির মঞ্চ হিসেবেও দেখা যায়। ট্রাম্প চাইতে পারেন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দৃশ্যমান সাফল্য; পুতিন চাইতে পারেন রাশিয়ার অবস্থান শক্তিশালী করা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নিজের অনুকূলে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া; আর শি জিনপিং চাইতে পারেন চীনের কূটনৈতিক মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়ানো। এই লক্ষ্যগুলো আংশিকভাবে মিলতে পারে, আবার সংঘর্ষেও জড়াতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া মানেই বিশ্বব্যবস্থার হিসাব পুরোপুরি উল্টে গেছে- এমন নয়। কিন্তু এমন বৈঠকের প্রস্তাবই দেখিয়ে দেয়, বিশ্বরাজনীতি আর শুধু একটি কেন্দ্রের নির্দেশে চলছে না। বিভিন্ন শক্তি নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। সেই সমীকরণে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের মতামত যেন বড় শক্তির দরকষাকষির আড়ালে হারিয়ে না যায়, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
আমার মতে, এই বৈঠকের সাফল্য বিচার করতে হবে নেতারা একসঙ্গে বসেছেন কি না, শুধু তা দিয়ে নয়; বরং তারা পারমাণবিক ঝুঁকি কমাতে কী বাস্তব পদক্ষেপ নিচ্ছেন, ইউক্রেনের মতো আক্রান্ত রাষ্ট্রের অধিকার কতটা স্বীকার করছেন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে কতটা কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাচ্ছেন, তা দিয়ে। কারণ পরাশক্তিরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করতে পারে, কিন্তু সেই সমঝোতার মূল্য যদি দিতে হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ও সাধারণ মানুষকে, তাহলে তাকে স্থায়ী শান্তি বলা কঠিন। বিশ্বের সামনে সবথেকে বড় প্রশ্ন হলো, তিন পরাশক্তির বৈঠক কি সংঘাত কমানোর পথ খুলবে, নাকি বড় শক্তিগুলোর স্বার্থের নতুন সমীকরণে ছোট দেশগুলোর ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে?
- এফ.আর. ইমরান– সিটিজেন্স ভয়েস-এর নির্বাহী সম্পাদক
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (ডব্লিউএসজে), ক্রিমলিন, চীনের পররাষ্ট্র, সিপ্রি ইয়ারবুক ২০২৬, ব্লুমবার্গ, এপি, ইউ.এস. ট্রেজারি (OFAC), এপেক ২০২৬, ইউক্রেনস্কা প্রাভাদা।

