একটি ভোট, বায়ান্ন বছরের স্মৃতি। এই মাসের শেষে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কিউবার ওপর মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রস্তাবে ভোট হবে। বাংলাদেশের কাছে এটি নিছক রুটিন ভোট নয়। অন্য অনেক দেশের তুলনায় আমরা ভালো জানি, কিউবার সঙ্গে বাণিজ্যের অজুহাতে একটি ক্ষুধার্ত জাতির খাদ্যসহায়তা কীভাবে আটকে যেতে পারে।
১৯৯২ সাল থেকে প্রতিবছর এই প্রস্তাব উত্থাপন করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিল ১৬৫টি দেশ, বিপক্ষে ছিল সাতটি এবং ভোটদানে বিরত ছিল ১২টি দেশ। এবার ভোটের আগে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশকে চাপ দিয়ে তাদের ভোট বদলাতে চাইছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবরণেও বলা হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জাতিসংঘে ‘অভিন্ন অগ্রাধিকার’ এগিয়ে নিতে কয়েকজন রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন।
১৯৭৪: শর্ত যখন অস্ত্র হয়
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পেছনে একটিমাত্র কারণ ছিল না। বন্যা ছিল, মজুতদারি ছিল, রেশনব্যবস্থার দুর্বলতা ছিল। গবেষকদের অনেকে দেখিয়েছেন, সে বছর খাদ্যশস্যের উৎপাদন তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। তবু একটি বাইরের কারণ আলাদাভাবে চোখে পড়ে। মার্কিন খাদ্যসহায়তা আইন পাবলিক ল ৪৮০-এর আওতায় চুক্তি নিয়ে আলোচনার সময় কিউবায় পাটজাত পণ্য রপ্তানির বিষয়টি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তৎকালীন সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, এর ফলে খাদ্যসহায়তা পাঠানোর প্রক্রিয়া পিছিয়ে যায়। সে সময়ের মার্কিন কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে একে রাজনৈতিক শাস্তি বলেননি, কিন্তু বাংলাদেশের অনেক মানুষ ঘটনাটিকে সেভাবেই দেখেছেন।
সরকারি হিসাবে, দুর্ভিক্ষে মারা গিয়েছিলেন প্রায় ২৭ হাজার মানুষ। বিভিন্ন গবেষকের হিসাবে, সংখ্যাটি প্রায় ১৫ লাখ। খাদ্যসহায়তা শেষ পর্যন্ত এসেছিল, কিন্তু তা আসার আগেই বহু মানুষের জন্য অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
এই ইতিহাসের শিক্ষা এই নয় যে সব দায় ওয়াশিংটনের। শিক্ষা হলো, সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল দেশে শর্তের মূল্য দিতে হয় সবচেয়ে গরিব মানুষকে—শর্ত যে-ই আরোপ করুক না কেন।
এবার নিশানায় ডাক্তার
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাস হওয়া মার্কিন বরাদ্দ আইনে এমন একটি ধারা যুক্ত হয়েছে, যার ফলে কিউবার চিকিৎসক পাঠানোর বিনিময়ে কিউবা সরকারকে অর্থ দেয়—এমন দেশ ও সংস্থার তালিকা তৈরি করতে হবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে। ধারাটির প্রস্তাবক কংগ্রেস সদস্য মারিও দিয়াজ-বালার্টের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে সাহায্য কমানো, ভিসা নিষেধাজ্ঞা আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ খোলা থাকছে। ব্রাজিল, গ্রেনাডা ও কয়েকটি আফ্রিকান দেশের কর্মকর্তাদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথাও জানা গেছে।
এর প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো। লক্ষ্য কিউবার সরকার, কিন্তু মূল্য দিতে হচ্ছে তৃতীয় দেশগুলোকে এবং সেসব দেশের গ্রামাঞ্চলের রোগীদের। কিউবার সরকারি পত্রিকার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৫০টির বেশি দেশে ২০ হাজারের বেশি কিউবান চিকিৎসাকর্মী কাজ করছিলেন। তাঁদের বেশির ভাগই এমন এলাকায় কাজ করতেন, যেখানে নিজ দেশের চিকিৎসকেরা যেতে চান না। জ্যামাইকা ও গুয়াতেমালার মতো কয়েকটি দেশ এই কর্মসূচি গুটিয়ে নিচ্ছে বলেও খবর এসেছে।
বাংলাদেশের মানুষ এই চিকিৎসকদের কাজের সঙ্গে পরিচিত। ২০০৫ সালের কাশ্মীর ভূমিকম্পের পর কিউবার চিকিৎসকেরা পাকিস্তানে ফিল্ড হাসপাতাল পরিচালনা করেছিলেন। পরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য কিউবায় চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়ার বৃত্তিও দেওয়া হয়েছিল। দুর্যোগের সময় চিকিৎসকদের ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে আটকে ফেলার ঝুঁকিটা এখানেই।
কিউবার নিজের সংকট এড়িয়ে যাওয়া যায় না
কিউবার স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবক্ষয় শুধু বাইরের চাপের ফল নয়। কিউবার সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটিতে চিকিৎসকের সংখ্যা এক লাখ ছয় হাজার ১৩১ থেকে কমে ৭৫ হাজার ৩৬৪-এ দাঁড়িয়েছে। এই পতন তীব্র জ্বালানি সংকটের আগেই শুরু হয়েছিল। বেতন এত কম যে অনেকে পেশা ছাড়ছেন বা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। একই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিনিয়োগের বড় অংশ গেছে হোটেল ও রিয়েল এস্টেট খাতে, স্বাস্থ্য খাতে তুলনামূলকভাবে সামান্য।
তাই নৈতিক অবস্থানটি সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র কিউবার চিকিৎসক কর্মসূচিকে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ ও ‘মানব পাচার’ বলে অভিহিত করে। যেসব চুক্তিতে চিকিৎসকেরা তাঁদের কাজের বিনিময়ে পাওয়া অর্থের সামান্য অংশ পান, সেগুলোর সমালোচনা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সমস্যার সমাধান যদি চিকিৎসকদের সরাসরি পারিশ্রমিক দেওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা হয়—বাহামা এমন ব্যবস্থা চাইছে বলে জানা যায়—তাহলে সেই পথ খোলা রেখে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কমানো যেত। পুরো কর্মসূচি বন্ধ করে দিলে সবচেয়ে আগে ক্ষতিগ্রস্ত হন রোগীরা, কিউবার সরকার নয়।
বাংলাদেশের করণীয়
প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেওয়াই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ বরাবরই এই অবস্থান নিয়ে এসেছে। প্রস্তাবটি বাণিজ্য ও মানবিক সহায়তার পথে বাধা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু ভোট একটি অবস্থানের প্রকাশ, পূর্ণাঙ্গ নীতি নয়। প্রস্তাবটি বাধ্যতামূলক নয়। তাই ভোটের পর সম্ভাব্য ঝুঁকি সামলানোর প্রস্তুতিও দরকার।
- নিজের নির্ভরতা মাপুন: পোশাক রপ্তানির বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। শুল্ক বা সাহায্য নিয়ে চাপ এলে কী কী বিকল্প আছে, তার একটি স্পষ্ট হিসাব সরকারের হাতে থাকা উচিত।
- একা নয়, দলবদ্ধভাবে বলুন: ছোট ও মাঝারি দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে অবস্থান নিলে চাপের ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া যায়।
- নীতি স্পষ্ট করুন: কিউবার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং একটি দেশের সাধারণ মানুষকে সামগ্রিকভাবে শাস্তি দেওয়ার বিরোধিতা করা—দুটি অবস্থানই একসঙ্গে নেওয়া সম্ভব।
১৯৭৪ সালে আমরা নীরব ছিলাম না, কিন্তু আমাদের ক্ষমতাও সীমিত ছিল। এখনো আমাদের ক্ষমতা সীমিত, তবে বিকল্প রয়েছে। সেটিই এই ভোটের আসল পরীক্ষা।
বিপরীত যুক্তি, আর শেষ কথা
এই অবস্থানের বিপক্ষেও জোরালো যুক্তি রয়েছে। আইনের প্রস্তাবকদের দাবি, কিউবা সরকার চিকিৎসকদের পাসপোর্ট আটকে রাখে, তাঁদের পরিবারকে জিম্মির মতো দেশে আটকে রাখে এবং কর্মসূচি ছেড়ে দেশে ফিরলে শাস্তি দেয়। তাঁদের মতে, এই কর্মসূচি থেকে পাওয়া অর্থ কিউবার শাসকদের জন্য বড় আর্থিক জোগান এবং তা বন্ধ করা মানবাধিকারের পক্ষেই কাজ করবে। যুক্তরাষ্ট্র আরও বলে, কিউবার সংকটের মূল কারণ দেশটির নিজস্ব অর্থনৈতিক নীতি। কিউবার কিছু চিকিৎসক এই কর্মসূচিকে নিজেদের ইচ্ছায় বেছে নেওয়া কাজ বলে বর্ণনা করেন, আবার অন্য অনেকে একে দাসত্বের সমতুল্য বলে মনে করেন। দুই ধরনের দাবিই রয়েছে, যদিও সেগুলোর সত্যতা ও ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা কঠিন।
এসব যুক্তি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। তবু প্রশ্ন থেকে যায়: চিকিৎসকদের অধিকার সুরক্ষার জন্য তৃতীয় কোনো দেশের গ্রামের হাসপাতাল চিকিৎসকশূন্য করে দেওয়া, কিংবা আইনি শর্তের ভয়ে সাহায্যনির্ভর দেশকে নীরব করা—এগুলো কি সবচেয়ে কার্যকর উপায়? ১৯৭৪ সালের অভিজ্ঞতা বলে, শর্তের ভার শেষ পর্যন্ত পড়ে সেই মানুষের ওপর, যাঁর ক্ষমতা সবচেয়ে কম। বাংলাদেশের ভোট যেদিকেই যাক, সেটি হওয়া উচিত ইতিহাসের শিক্ষা ও নিজের স্বার্থ বুঝে নেওয়ার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত।

