প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়েছিলেন, জনমত জরিপেও ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর পক্ষে ছিল কট্টর ডানপন্থীদের শক্তিশালী সমর্থন, আর লুলার সামনে ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়, অপরাধ, রাজনৈতিক বিভাজন ও নিজের প্রচারণার দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার কঠিন চ্যালেঞ্জ। অথচ মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে সেই সমীকরণ উল্টে দিয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিলেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।
২৫ অক্টোবরের দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে লুলা পেয়েছেন ৫১.৭৯ শতাংশ ভোট, আর ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮.২১ শতাংশ। প্রায় ৪৩ লাখ ভোটের ব্যবধানে এই জয় এসেছে এমন এক নির্বাচনে, যেখানে প্রথম দফায় লুলা পিছিয়ে ছিলেন ২২ লাখেরও বেশি ভোটে। ১৯৮৯ সালে ব্রাজিলে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম কোনো প্রার্থী প্রথম দফায় দ্বিতীয় স্থানে থেকেও দ্বিতীয় দফায় জয়ী হলেন।
কিন্তু এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে কি শুধু লুলার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কাজ করেছে? নাকি প্রতিদ্বন্দ্বীর ভুল, ভোটারদের নতুন করে সংগঠিত করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৌশল বদলানো এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কও বড় ভূমিকা রেখেছে? তিনটি প্রতিবেদনের তথ্য মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, লুলার জয় কোনো একক কৌশলের ফল নয়; বরং কয়েকটি রাজনৈতিক হিসাব একই সময়ে তাঁর পক্ষে কাজ করেছে।
তিন সপ্তাহে পাল্টে দিলেন খেলা
লুলার প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে বড় রহস্য ছিল- প্রথম দফার পরাজয়কে চূড়ান্ত সংকেত হিসেবে না দেখে নিজের প্রচারণার দুর্বলতা শুধরে নেওয়া। ৪ অক্টোবরের ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৭.০৩ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন, যেখানে লুলা পেয়েছিলেন ৪৫.১৬ শতাংশ। ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ২২ লাখ। অথচ দ্বিতীয় দফায় লুলা ৫১.৭৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ফ্লাভিওর ৪৮.২১ শতাংশকে পেছনে ফেলেন। ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ লাখ ভোটে।

এই পরিবর্তনের পেছনে ছিল ভোটারদের পুনরায় সক্রিয় করার কৌশল। প্রথম দফায় প্রায় ২১ শতাংশ ভোটার ভোট দেননি। দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভোটদানে বিরত থাকার প্রবণতা লুলার সমর্থকগোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ভোটারদের মধ্যে বেশি ছিল। ফলে দ্বিতীয় দফায় তাঁর প্রচারণার লক্ষ্য শুধু নতুন সমর্থক তৈরি করা ছিল না; বরং যারা প্রথমবার ভোট দিতে যাননি, তাঁদেরও ভোটকেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা।
লুলা জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থকে সামনে এনে প্রচারণাকে আরও সরাসরি করেন। সপ্তাহান্তে বিনা মূল্যে গণপরিবহন চালুর মতো উদ্যোগও ভোটারদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক বার্তার সংযোগ তৈরি করে। তবে এসব প্রণোদনা কত ভোটারের সিদ্ধান্ত বদলেছে, তার নির্ভরযোগ্য পৃথক হিসাব নেই।
আরেকটি বড় ভূমিকা ছিল নাগরিক আন্দোলন ও সমর্থকদের মাঠপর্যায়ের তৎপরতা। নির্বাচনের আগে রিও ডি জেনিরোর কোপাকাবানা সৈকত এবং সাও পাওলোর রাস্তায় বড় সমাবেশ লুলার সমর্থকদের নতুন করে উদ্দীপ্ত করে। একই সময়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বলসোনারোবিরোধী বিক্ষোভও রাজনৈতিক আলোচনায় গতি আনে।
এখানেই লুলার কৌশলের আসল দিকটি স্পষ্ট হয়। তিনি শুধু নিজের পুরোনো সমর্থকদের ওপর নির্ভর করেননি; বরং ভোটারদের সক্রিয় করা, সামাজিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ সামনে আনা এবং বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে উদ্বিগ্ন মানুষকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করেছেন। প্রথম দফার ধাক্কাকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করাই ছিল তাঁর প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রীয় কৌশল।
ডিজিটাল যুদ্ধের মোড় ঘোরানো কৌশল
এই নির্বাচনে ভোটের লড়াইয়ের পাশাপাশি চলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেরও তীব্র প্রতিযোগিতা। ফ্লাভিও বলসোনারো অপরাধ, শহুরে সহিংসতা, বন্দুক রাখার অধিকার এবং সামাজিক রক্ষণশীলতার মতো বিষয়কে সামনে এনে ভোটারদের আকৃষ্ট করেছিলেন। কয়েক দশক ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় একটি পরিবারের সদস্য হয়েও তিনি নিজেকে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরোধী হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। তাঁর প্রচারণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার ছিল গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
কিন্তু প্রথম দফার পর লুলার শিবিরও ডিজিটাল কৌশলে বড় পরিবর্তন আনে। দ্য গার্ডিয়ানের ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘লুলার আর্মি’ নামে পরিচিত হোয়াটসঅ্যাপভিত্তিক নেটওয়ার্কে লাখো মানুষ যুক্ত হন। সেখানে সমর্থকদের প্রচারণার উপকরণ ছড়িয়ে দেওয়া, অনলাইনে বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল এবং সমর্থনমূলক কনটেন্টকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

৮০ বছর বয়সী লুলা নিজেও ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে সক্রিয় হন। প্রচলিত রাজনৈতিক সমাবেশ ও টেলিভিশন বিতর্কের পাশাপাশি তিনি এমন একটি ডিজিটাল পরিসরে প্রবেশ করেন, যেখানে তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছানো এবং সমর্থকদের সরাসরি সংগঠিত করা সম্ভব। দ্য গার্ডিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফার প্রচারণায় তাঁর ডিজিটাল উপস্থিতি ফ্লাভিওর তুলনায় বেড়ে যায়।
তবে ডিজিটাল লড়াইটি একতরফা ছিল না। এক ডজন পর্যবেক্ষক সংস্থা ও গবেষণা গোষ্ঠী অভিযোগ তুলেছিল, মেটার প্ল্যাটফর্মে ফ্লাভিওর প্রচারণা তুলনামূলক সুবিধা পেয়ে থাকতে পারে। ব্রাজিলের নির্বাচনী আদালত প্রার্থীদের প্রতি অসম আচরণ না করার নির্দেশ দিয়েছিল। মেটা অবশ্য অভিযোগগুলোকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে এই ঘটনাকে প্রমাণিত পক্ষপাত হিসেবে নয়, বরং নির্বাচনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর বিতর্ক হিসেবে দেখা উচিত।
ফ্লাভিওর প্রচারণা শেষ পর্যায়ে ব্যক্তিগত বিতর্কেরও মুখে পড়ে। ব্রাজিলের সাময়িকী পিয়াউই দাবি করে, ২০২০ সালের করোনাভাইরাস মহামারির সময় তিনি একটি নৌযানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যৌনকর্মী ও টিকা-সংক্রান্ত লবিস্টদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। এই অভিযোগ নির্বাচনের আগে আলোচনায় আসে; তবে প্রতিবেদনটির দাবি এবং স্বাধীনভাবে প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। একইভাবে টিভি গ্লোবোর বিতর্কে লুলাকে ‘নয় আঙুলওয়ালা’ বলে সম্বোধন করার ঘটনাও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। লুলা এর জবাবে নিজের শ্রমজীবী অতীত তুলে ধরেন।
এই ঘটনাগুলোকে আলাদা করে নির্বাচনের ফল নির্ধারণকারী কারণ বলা যাবে না। কিন্তু সব মিলিয়ে লুলার প্রচারণা প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া বিতর্ককে কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছে, আর ডিজিটাল সংগঠনের মাধ্যমে নিজের সমর্থকদের আরও সক্রিয় করেছে।
অর্থাৎ, লুলা শুধু অনলাইনে উপস্থিতি বাড়াননি; ডিজিটাল প্রচারণাকে ভোটার সংগঠিত করার বৃহত্তর কৌশলের অংশে পরিণত করেছেন। এই পরিবর্তন তাঁর ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও একমাত্র কারণ নয়।
প্রতিদ্বন্দ্বীর ভুল, লুলার সুযোগ
নির্বাচনে নিজের শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বীর দুর্বলতাকে কাজে লাগানোও গুরুত্বপূর্ণ। ফ্লাভিও বলসোনারো তাঁর বাবা, সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কাজে লাগিয়ে কট্টর ডানপন্থী সমর্থকদের সংগঠিত করেছিলেন। কিন্তু এই পরিচয় একই সঙ্গে তাঁর জন্য সীমাবদ্ধতাও তৈরি করে, কারণ বলসোনারো পরিবারের রাজনীতি নিয়ে ব্রাজিলে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে ফ্লাভিওর একটি মন্তব্য বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। টিভি গ্লোবোর বিতর্কে তিনি লুলাকে ‘নয় আঙুলওয়ালা’ বলে সম্বোধন করেন, যা লুলার তরুণ বয়সে কারখানার দুর্ঘটনায় একটি আঙুল হারানোর ঘটনাকে ইঙ্গিত করে। লুলা এর জবাবে বলেন, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জীবনে কখনো কাজ করেননি এবং ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। মন্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর লুলার প্রচারণা তাঁর শ্রমজীবী অতীতকে সামনে আনার সুযোগ পায়।
এই ঘটনাকে নির্বাচনের ফল পরিবর্তনের একমাত্র কারণ বলা যাবে না। তবে এটি দেখায়, ব্যক্তিগত আক্রমণ কখনো কখনো উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে- বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষ নিজের শ্রমজীবী পরিচয়কে রাজনৈতিক শক্তির অংশ হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হন।
লুলার প্রচারণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর সমর্থনভিত্তির বাইরে ভোটারদের কাছে পৌঁছানো। তাঁর পক্ষে ভোট দেওয়া প্রত্যেকেই যে তাঁর সব নীতির সমর্থক ছিলেন, তা নয়। কেউ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ধারাবাহিকতা চেয়েছেন, কেউ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, আবার কেউ বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে চেয়েছেন।
এই ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যকে একটি নির্বাচনী জোটে পরিণত করাই লুলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অন্যদিকে ফ্লাভিওর প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট দেখায়, তাঁর রাজনৈতিক শিবিরও যথেষ্ট শক্তিশালী। তাই ফলটিকে ডানপন্থী রাজনীতির অবসান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
ট্রাম্পের ছায়া, আমাজনের প্রশ্ন
লুলার এই জয় ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাইরেও আন্তর্জাতিক প্রভাব ফেলতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বলসোনারো পরিবারের ঘনিষ্ঠতা এবং ব্রাজিলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক চাপ নির্বাচনী প্রচারণায় জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে ফ্লাভিওকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেননি। তবে তাঁর প্রশাসন ও বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক সম্পর্ক নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আলোচিত হয়েছে। এর আগে ট্রাম্প সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বিচারকে ‘রাজনৈতিক নিপীড়ন’ বলে আখ্যা দেন এবং ব্রাজিলের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপকে লুলা ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি চাপ হিসেবে তুলে ধরেন।

এখানে লুলার প্রচারণা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা সামনে আনে- ব্রাজিলের পররাষ্ট্রনীতি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; চীন, রাশিয়া ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখে দেশটি নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষা করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রেখেও সামরিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে স্বাধীন অবস্থান নেওয়ার এই নীতি তাঁর বৃহত্তর বহুপাক্ষিক পররাষ্ট্রনীতির অংশ।
লুলার জয় তাই ট্রাম্পের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার জন্য একটি রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্রাজিল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ভেঙে পড়বে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে পারস্পরিক স্বার্থ রয়েছে। বাস্তবতা হলো, লুলা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও ব্রাজিলের নীতিগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে চাইবেন।
এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আমাজন বন ও পরিবেশনীতি। লুলার আগের মেয়াদে আমাজন অঞ্চলে বন উজাড় কমানো, অবৈধ খনির বিরুদ্ধে অভিযান এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর সরকারের সময় আমাজনে বন উজাড় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। লুলার পুনর্নির্বাচন এসব নীতি অব্যাহত রাখার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, ফ্লাভিও বলসোনারোর রাজনৈতিক অবস্থান তাঁর বাবা জাইর বলসোনারোর পরিবেশনীতি ও আমাজন অঞ্চলের অর্থনৈতিক ব্যবহারের প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে। তাঁর শিবির বনাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ এবং পরিবেশগত বিধিনিষেধ নিয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। ফলে নির্বাচনটি শুধু দুই প্রার্থীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাৎপর্য বহন করে।
তবে এখানেও লুলার সামনে সহজ পথ নেই। নতুন কংগ্রেসে রক্ষণশীল ও ডানপন্থী রাজনীতিকদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, আদিবাসীদের অধিকার এবং অবৈধ খনি দমনের নীতি বাস্তবায়নে তাঁকে আইনসভায় কঠিন সমঝোতার মুখোমুখি হতে হবে।
লুলার চতুর্থ মেয়াদের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব তাই দুই জায়গায়- ট্রাম্পের প্রভাবের মুখে ব্রাজিলের কূটনৈতিক স্বাধীনতা ধরে রাখা এবং আমাজন সংরক্ষণের অঙ্গীকারকে বাস্তব নীতিতে রূপ দেওয়া। নির্বাচনী জয় তাঁকে এই সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু সাফল্য নির্ভর করবে পরবর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের ওপর।
জয় ঐতিহাসিক হলেও সামনে কঠিন লড়াই
লুলার চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের এক অসাধারণ অধ্যায়। কিন্তু নির্বাচনে জয় পাওয়া আর দেশ পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। নতুন মেয়াদে তাঁকে একটি রক্ষণশীল প্রভাবশালী কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যেখানে বাজেট, সামাজিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং পরিবেশনীতি নিয়ে সমঝোতা কঠিন হতে পারে।

অর্থনীতিও বড় পরীক্ষা। সরকারি ব্যয়, ঋণ, সুদের হার এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। ভোটাররা যে প্রত্যাশা নিয়ে তাঁকে আবার নির্বাচিত করেছেন, তার বাস্তব ফল দেখতে চাইবেন। প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে এই নির্বাচনী সাফল্য ভবিষ্যতে রাজনৈতিক চাপেও পরিণত হতে পারে।
নির্বাচনের ফল নিয়ে ফ্লাভিও বলসোনারোর আপত্তি এবং ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানো নিয়ে বিতর্কও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। তিনি ফল বাতিলের আইনি চেষ্টা করার কথা বলেছেন। তবে অভিযোগ উত্থাপন করা আর নির্বাচনে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের ঘোষিত ফল ও আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
সব মিলিয়ে, লুলার প্রত্যাবর্তনের পেছনে ছিল দ্রুত প্রচারণা পুনর্গঠন, ডিজিটাল সংগঠন, ভোটারদের সক্রিয় করা, প্রতিদ্বন্দ্বীর বিতর্কিত অবস্থান কাজে লাগানো এবং নিজের সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরে একটি বিস্তৃত জোট গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। প্রথম দফায় পিছিয়ে থেকেও জয় ছিনিয়ে নেওয়া নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক ঘটনা; কিন্তু ব্রাজিলের রাজনৈতিক বিভাজন এতে শেষ হয়ে যায়নি।
লুলার সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, নির্বাচনী প্রচারণায় গড়ে ওঠা আস্থাকে কার্যকর শাসন, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশ্বাসে রূপান্তর করা। কারণ, অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ঘটানো এক ধরনের রাজনৈতিক দক্ষতা; কিন্তু সেই জয়ের প্রত্যাশা পূরণ করাই হবে তাঁর চতুর্থ মেয়াদের প্রকৃত পরীক্ষা।

