প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র দুই বছর পর আবারও ভোটের আয়োজন যুক্তরাষ্ট্রে। ৩ নভেম্বরের এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নয়, নির্বাচিত হবেন কংগ্রেসের সদস্যরা। কিন্তু এই ভোটের ফলই নির্ধারণ করতে পারে ট্রাম্প তাঁর বাকি দুই বছর কতটা নির্বিঘ্নে দেশ পরিচালনা করতে পারবেন।
২০২৪ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে পরাজিত করে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরেছেন রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প। চার বছরের মেয়াদে তাঁর হাতে এখনো দুই বছরের বেশি সময় রয়েছে। অথচ এর মধ্যেই আবারও নির্বাচনের মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ৩ নভেম্বর দেশটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন।
অনেকের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র দুই বছর পর আবার নির্বাচন কেন? এই ভোটে কি ট্রাম্পের ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে? নাকি নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে? আসলে এর কোনোটিই নয়। মধ্যবর্তী নির্বাচন হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নির্বাচন। তবে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কম নয়। কারণ এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে, ট্রাম্পের বাকি দুই বছরের শাসনামলে তাঁর নিজের দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে, নাকি বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তাঁর প্রশাসনের ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের হাতে ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতা থাকলেও তিনি এককভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার সব সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আইন প্রণয়ন, জাতীয় বাজেট অনুমোদন, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কংগ্রেসের। ফলে হোয়াইট হাউসে যে দলের প্রেসিডেন্ট থাকেন, কংগ্রেসে সেই দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা তাঁর জন্য বড় রাজনৈতিক সুবিধা। আর সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে প্রেসিডেন্টকে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বিরোধী দলের বাধার মুখে পড়তে হয়।
এ কারণেই মধ্যবর্তী নির্বাচনকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রেসিডেন্টের প্রথম দুই বছরের শাসনামলের ওপর জনগণের মূল্যায়ন হিসেবে দেখেন। ভোটাররা সরাসরি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ভোট না দিলেও তাঁর দলের প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়ে প্রশাসনের প্রতি সমর্থন কিংবা অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচন কী, ভোট দেবেন কারা?
যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট বা সংসদ বা আইনসভার নাম কংগ্রেস। এটি দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট। নিম্নকক্ষের নাম হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদ ও উচ্চকক্ষের নাম সিনেট। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সদস্যকে ‘হাউস সদস্য’ ও সিনেটের সদস্যকে ‘সিনেটর’ বলা হয়। প্রতিনিধি পরিষদে ৪৩৫টি ভোটাধিকারসম্পন্ন আসন রয়েছে। অন্যদিকে সিনেটে মোট সদস্য ১০০ জন। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্য থেকে প্রতিটি রাজ্যের জন্য দুজন করে সিনেটর নির্বাচিত হন।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে। তাই একে মিডটার্ম বা মধ্যবর্তী নির্বাচন বলা হয়। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বরের নির্বাচনেও ভোটাররা প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের নির্ধারিত আসনগুলোর জন্য ভোট দেবেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গভর্নর, স্থানীয় আইনসভা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এই নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে। তবে স্বতন্ত্র ও ছোট দলের প্রার্থীরাও অংশ নেবেন। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ২১৮টি আসন প্রয়োজন। সিনেটে সাধারণ আইন পাসের ক্ষেত্রে ১০০ সদস্যের মধ্যে সাধারণত ৫১ ভোট প্রয়োজন হয়; তবে কিছু ক্ষেত্রে ফিলিবাস্টার ও অন্যান্য সংসদীয় নিয়মের কারণে ৬০ ভোটের প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থাৎ, মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কয়েক শ কংগ্রেস সদস্য নির্বাচনের বিষয় নয়। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগামী দুই বছরের আইন প্রণয়ন, বাজেট, অভিবাসননীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রেসিডেন্টের প্রশাসনিক ক্ষমতার ওপর নজরদারির রাজনৈতিক পরিবেশও নির্ধারিত হবে।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১১৯তম কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরুর পর সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি। ডেমোক্র্যাটদের ৪৫ জন সদস্যের পাশাপাশি দুজন স্বতন্ত্র সিনেটর রয়েছেন, যাঁরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ককাস (আইনপ্রণেতাদের দলীয় জোট) করেন। ফলে সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ৫৩-৪৭।
প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও সংকীর্ণ। ২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষভাগের হিসাব অনুযায়ী, দলটির হাতে রয়েছে ২১৮টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি এবং একজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন। পাশাপাশি দুটি আসন শূন্য। অর্থাৎ মাত্র কয়েকটি আসনের ব্যবধানেই প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হচ্ছে।

কিন্তু মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের যেকোনো একটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারলে পরিস্থিতি বদলে যাবে। ট্রাম্পের প্রশাসন তখন আর আগের মতো সহজে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারবে না। বাজেট নিয়ে দর-কষাকষি বাড়বে, বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কংগ্রেসে শুনানি হতে পারে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে।
বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে গেলে তারা বিভিন্ন কমিটির চেয়ারম্যান পদ পাবে। এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি, সরকারি ব্যয়, পররাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্যনীতি এবং নির্বাহী ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে তদন্ত ও শুনানির সুযোগ তৈরি হবে। প্রয়োজন হলে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কংগ্রেসে হাজির করে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার উদ্যোগও নেওয়া সম্ভব।
তবে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই বিরোধী দল প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে দিতে পারে না। অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট প্রয়োজন হলেও প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে অপসারণের জন্য সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। ফলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক চাপ বাড়লেও শুধু মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয় তাঁর প্রেসিডেন্ট পদ কেড়ে নেবে না।
ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা: কংগ্রেসকে পাশ কাটানোর অভিযোগ
ট্রাম্পের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো নির্বাহী আদেশের ব্যবহার। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নির্বাহী আদেশ জারি করতে পারেন। তবে এই ক্ষমতা অসীম নয়। কংগ্রেসের আইন, আদালতের রায় এবং সংবিধান তাঁর নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে কংগ্রেসের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা না করে নির্বাহী ক্ষমতার ওপর বেশি নির্ভর করছেন। অভিবাসন, বাণিজ্য, সরকারি প্রশাসন এবং পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর এই প্রবণতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। তবে প্রেসিডেন্ট একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারেন। এ নিয়ে কংগ্রেসের War Powers Resolution-ও রয়েছে। ফলে প্রেসিডেন্টের সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বৈধতা নিয়ে প্রায়ই সাংবিধানিক বিতর্ক তৈরি হয়।
ট্রাম্পের ইরাননীতি নিয়ে সমালোচকদের বক্তব্য হলো, সামরিক অভিযানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কংগ্রেসের ভূমিকা ও জনসমর্থন যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। তাঁদের মতে, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক শক্তি প্রদর্শনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং মার্কিন নাগরিকদের জীবনও জড়িত।
এ কারণেই ডেমোক্র্যাটরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে আগ্রহী। তারা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক সিদ্ধান্ত, নির্বাহী আদেশ এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর আরও কঠোর নজরদারি চালানোর সুযোগ পাবে।
ট্রাম্প কি রাজনৈতিক চাপে?
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো মার্কিন ভোটারদের মনোভাব। যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত নির্বাচনের সময় পররাষ্ট্রনীতির পাশাপাশি অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, জ্বালানি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে।

ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব মার্কিন বাজারেও পড়তে পারে। বিশেষ করে তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মার্কিন নাগরিকদেরও বহন করতে হয়।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রেও চাপের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। CNN-এর ২৭ অক্টোবর ২০২৬-এর Poll of Polls অনুযায়ী, বিভিন্ন জাতীয় জনমত জরিপের গড় হিসাবে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন ছিল ৩৪ শতাংশ এবং অসন্তোষ ছিল ৬৪ শতাংশ। এটি একটি একক জরিপের ফল নয়; কয়েকটি জরিপের সমন্বিত গড়। অন্যদিকে Reuters/Ipsos-এর ২২-২৬ অক্টোবরের জরিপেও তাঁর প্রতি সমর্থন ছিল ৩২ শতাংশ এবং অসন্তোষ ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিভিন্ন জরিপেই তাঁর প্রশাসন নিয়ে অসন্তোষের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি, শুল্ক আরোপ এবং মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন। তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি মার্কিন শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষার কথা বললেও এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক মহলে মতভেদ রয়েছে।
তবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে বলেই তাঁর দলের সব প্রার্থী নির্বাচনে পরাজিত হবেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। মধ্যবর্তী নির্বাচনে স্থানীয় অর্থনীতি, প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, অঙ্গরাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভোটার উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইরান যুদ্ধ কি ট্রাম্পের নির্বাচনী বোঝা হয়ে উঠছে?
ট্রাম্পের নির্বাচনী রাজনীতিতে ইরান সংঘাত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ তিনি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়ার কারণে তাঁর নীতির সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতির সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
মার্কিন ভোটারদের একটি অংশ জানতে চাইতে পারেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত অর্জন কী? দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কিংবা মার্কিন মিত্রদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে সামরিক অভিযান কতটা কার্যকর হয়েছে? আর এর বিপরীতে মার্কিন অর্থনীতি ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে?
এখানে ডেমোক্র্যাটদের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। তারা ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি, সামরিক ব্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোকে নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রে আনতে পারে। তাদের বক্তব্য হতে পারে, বিদেশে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে অর্থ ব্যয় করার পরিবর্তে সেই অর্থ দেশের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ব্যয় করা উচিত।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা যুক্তি দিতে পারেন, ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের অংশ। ফলে নির্বাচনে ইরান প্রশ্নটি শুধু যুদ্ধের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকা কতটা হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নও সামনে আসবে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন কি ট্রাম্পের জন্য গণভোট?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে অনেক সময় প্রেসিডেন্টের ওপর এক ধরনের গণভোট বলা হয়। যদিও এটি আনুষ্ঠানিক গণভোট নয়, তবু ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের প্রথম দুই বছরের কাজকর্ম নিয়ে ভোটারদের মনোভাব এতে প্রতিফলিত হয়।
ইতিহাসেও দেখা গেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রায়ই আসন হারায়। তবে সব নির্বাচনের ফল এক রকম হয় না। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক বিভাজন, যুদ্ধ, জনমত এবং বিরোধী দলের প্রচারণার ওপর ফলাফল নির্ভর করে।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেকটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তিনি নিজেই বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারণায় সামনে আসছেন এবং রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাইছেন। এমনকি ভোটারদের উদ্দেশে তাঁকে ব্যালট পেপারে থাকা প্রার্থীর মতো বিবেচনা করে ভোট দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন বলে আপনার দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এতে বোঝা যায়, তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনকে শুধু কংগ্রেসের আসন ধরে রাখার লড়াই হিসেবে দেখছেন না; বরং নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেও বিবেচনা করছেন।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য হলো, কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তারা তদন্ত ও শুনানির মাধ্যমে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জবাবদিহি চাইতে পারবে। আর সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে বিচারপতি ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও তাদের প্রভাব বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের সামনে কী অপেক্ষা করছে?
৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনে রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প তাঁর বাকি মেয়াদে আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক নীতি বাস্তবায়নে তুলনামূলক সুবিধা পাবেন। বিপরীতে ডেমোক্র্যাটরা একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে তাঁর প্রশাসনের ওপর নজরদারি, তদন্ত এবং রাজনৈতিক চাপ অনেক বেড়ে যাবে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানো মানেই ট্রাম্পের ক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু তাঁর প্রশাসনের নীতিগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিরোধী কংগ্রেস বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এবারের নির্বাচনের আসল তাৎপর্য এখানেই। মার্কিন ভোটাররা শুধু প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের সদস্য নির্বাচন করবেন না; তাঁরা পরোক্ষভাবে জানিয়ে দেবেন, ট্রাম্পের প্রথম দুই বছরের শাসনামলে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর প্রতি তাঁদের সমর্থন কতটা রয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্প কি কংগ্রেসের উভয় কক্ষে নিজের দলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে বাকি দুই বছরও শক্ত অবস্থানে থাকতে পারবেন, নাকি ভোটাররা তাঁর ক্ষমতার ওপর নতুন রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করবেন? ৩ নভেম্বরের নির্বাচনই সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিয়ে দেবে।
তথ্যসূত্র: ইউএসএ-গভ (USA Gov) – মধ্যবর্তী নির্বাচন, ইউএস সিনেট- দলীয় বিভাজন, সিএনএন (CNN)- ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বিষয়ক জরিপগুলোর সমষ্টি (Poll of Polls), ব্যালটপিডিয়া (Ballotpedia)- ২০২৬ সালের কংগ্রেসনাল নির্বাচন, রয়টার্স/ইপসোস।

