ইসরায়েলের রাজনীতিতে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিকদের দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে, যাদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে সরকার গঠনের অংশীদার করতে ইহুদি রাজনীতিকদের বড় একটি অংশ অনাগ্রহী, এবার সেই আরবদের ভোটই হয়ে উঠেছে ক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাব। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন, কিন্তু বিরোধীরাও এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থানে নেই। দুই পক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের চূড়ান্ত গণনায় নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন, গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন ইহুদি বিরোধী দলগুলোর জোট পেয়েছে ৪৮টি এবং আরব নেতৃত্বাধীন দুটি দল পেয়েছে ১৯টি আসন। ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। অর্থাৎ নেতানিয়াহুর জোট আট আসন পিছিয়ে, আর আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া বিরোধীদের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সুযোগও নেই।
এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭৭.৯ শতাংশ, যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। আরব নাগরিকদের ভোটদানের হারও বেড়ে প্রায় ৭৬.৫ শতাংশে পৌঁছায়; কিছু ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের হিসাবে তা প্রায় ৮০ শতাংশ। তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর ১৯টি আসন অর্জনও নতুন রেকর্ড।
কিন্তু এই ফলের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য আসনসংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি ইসরায়েলের নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, জাতিগত বৈষম্য এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। যে আরব নাগরিকদের ভোট নিয়ে নেতানিয়াহু শিবিরের একাংশ সন্দেহ ও অভিযোগ তুলছে, সেই ভোটই এখন সরকার গঠনের সমীকরণে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন হলো, ইসরায়েলের রাজনীতিতে যাদের অনেক সময় ‘ভেতরের শত্রু’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তারাই কি এবার ক্ষমতার চাবি হাতে তুলে নিতে যাচ্ছেন?

আরবদের ভোটে নীরব রাজনৈতিক বিস্ফোরণ
ইসরায়েলের প্রায় ২১ শতাংশ নাগরিক ফিলিস্তিনি আরব বংশোদ্ভূত। তাঁদের অধিকাংশই ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর দেশটির ভেতরে থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর উত্তরসূরি। তাঁরা ইসরায়েলের নাগরিক, ভোটাধিকার রয়েছে এবং নেসেটে প্রতিনিধিত্ব করার সাংবিধানিক সুযোগও রয়েছে। তবে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার থাকলেই রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত হয় না।
আরব নাগরিকদের বিরুদ্ধে আবাসন, ভূমি, সরকারি পরিষেবা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ বহুদিনের। ২০১৮ সালের ইসরায়েলের ‘জাতিরাষ্ট্র আইন’ও বিতর্কের জন্ম দেয়। আইনটিতে ইহুদি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং আরবিকে রাষ্ট্রের বিশেষ মর্যাদার ভাষা করা হয়েছে। আরব রাজনৈতিক নেতারা ও অধিকারকর্মীদের একটি অংশ এটিকে নাগরিক সমতার পরিপন্থী বলে সমালোচনা করেন।
তবে আরব নাগরিকদের সবাই নির্বাচন বর্জন করেন, কিংবা তাঁরা ৮০ বছর ধরে একযোগে ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন- এমন দাবি ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। তাঁরা বিভিন্ন নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, আরব রাজনৈতিক দলগুলোও দীর্ঘদিন ধরে নেসেটে প্রতিনিধিত্ব করছে। এবারের বিশেষত্ব হলো, ভোটদানের হার বেড়ে যাওয়া এবং প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানো।
এর পেছনে গাজা যুদ্ধ একটি বড় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং ইসরায়েলের ভেতরে আরব নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। অনেক আরব ভোটারের কাছে নির্বাচন তাই শুধু সরকার পরিবর্তনের বিষয় ছিল না; বরং নিজেদের নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্নও ছিল।
মিডল ইস্ট আইয়ের নির্বাচনী প্রতিবেদনেও আরব নাগরিকদের মধ্যে এই উদ্বেগ ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে।
এখানে বড় পরিবর্তনটি হলো, আরব ভোটাররা নিজেদের রাজনৈতিক শক্তিকে শুধু প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; ভোটের মাধ্যমে সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব বাড়িয়েছেন। অর্থাৎ, যেসব সিদ্ধান্ত তাঁদের জীবনকে প্রভাবিত করে, সেগুলোতে নিজেদের কণ্ঠস্বর জোরালো করার চেষ্টা করেছেন।

নেতানিয়াহুর ‘ভোট চুরি’ অভিযোগ, কেন এত অস্বস্তি?
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর নেতানিয়াহু ও তাঁর রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ আরব নাগরিকদের ভোটের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এমনকি বিদেশি অর্থায়ন ও নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও সামনে এসেছে। কিন্তু এসব অভিযোগের সঙ্গে প্রমাণিত নির্বাচনী অনিয়মকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
টাইমস অব ইসরায়েলের ২৯ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কর্মকর্তারা ব্যাপক বা পরিকল্পিত ভোট জালিয়াতির অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাননি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও জানিয়েছে, আরব দলগুলোর নির্বাচনী সাফল্য নিয়ে অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ফল পরিবর্তনের মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এখানে রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও গভীর। কোনো নাগরিক তাঁর জাতিগত পরিচয়ের কারণে বেশি সংখ্যায় ভোট দিলেই সেই ভোট সন্দেহজনক হয়ে যায় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক যোগ্য নাগরিকের ভোট সমান। আরব নাগরিকদের বেশি অংশগ্রহণে কোনো রাজনৈতিক জোটের হিসাব বদলে গেলে সেটি নির্বাচনী প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক ফল।
নেতানিয়াহুর জন্য সমস্যাটি হলো, তাঁর জোটের আসন কমেছে এবং বিরোধীদের সঙ্গে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য সমর্থন যোগ করলে সংসদে একটি বিকল্প সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হয়। ফলে আরব ভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করার রাজনৈতিক বক্তব্য যতই সামনে আসুক, সরকার গঠনের আলোচনায় এই দলগুলোকে উপেক্ষা করা কঠিন।
ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজও নির্বাচনের পর আরব নাগরিকদের ভোটাধিকার ও নেতানিয়াহুর অভিযোগ নিয়ে কঠোর সম্পাদকীয় অবস্থান নিয়েছে। তাদের যুক্তি, আরবদের ভোটকে সন্দেহের চোখে দেখা মানে নাগরিক সমতার নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।

অর্থাৎ, এই নির্বাচনে আরবদের ভোট শুধু নেতানিয়াহুর জোটের আসন কমায়নি; বরং ইসরায়েলের গণতন্ত্রের দাবির সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও তুলে দিয়েছে- নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার থাকলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তাঁদের সমর্থন গ্রহণে আপত্তি কোথায়?
৬৭ আসন আছে, সরকার গড়ার সাহস আছে?
নির্বাচনের সবচেয়ে নাটকীয় অঙ্কটি এখানেই। নেতানিয়াহুবিরোধী ইহুদি দলগুলোর ৪৮ আসনের সঙ্গে জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আমের ১৯ আসন যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ৬৭। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১। অর্থাৎ কাগজে-কলমে নেতানিয়াহুবিরোধীদের হাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে এই ৬৭ আসনকে একটি সরকারে পরিণত করা কঠিন। কারণ, বিরোধী শিবিরের সব দল আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট করতে রাজি নয়। বিশেষ করে আভিগদোর লিবারম্যান ও নাফতালি বেনেটের রাজনৈতিক অবস্থান এ ক্ষেত্রে বড় বাধা।
এখানে গাদি আইজেনকটের সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। তিনি নেতানিয়াহুর বিকল্প সরকার গঠনের চেষ্টা করছেন, কিন্তু তাঁর জোটের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী থেকে মধ্যপন্থী ও বামপন্থী- বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের দল রয়েছে। আরব দলগুলোর সমর্থন গ্রহণ করলে তাঁর জোটের কিছু অংশ আপত্তি তুলতে পারে। আবার সেই সমর্থন প্রত্যাখ্যান করলে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
তবে আরব দলগুলোও সবাই একই কৌশলে এগোচ্ছে না। জয়েন্ট লিস্টের নেতা আহমাদ তিবি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁর দল সরকারে মন্ত্রীত্ব বা সরাসরি অংশীদার হতে চায় না। বরং আরব সমাজের সমস্যা সমাধানের বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি পেলে তারা বাইরে থেকে বিকল্প সরকারকে সমর্থন দিতে পারে। অপরাধ দমন, বেদুইন গ্রামগুলোর স্বীকৃতি এবং আরব নাগরিকদের নিরাপত্তা তাদের গুরুত্বপূর্ণ দাবির মধ্যে রয়েছে।
টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনেও আহমাদ তিবির বক্তব্য উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, তাঁরা সরকারে যেতে চান না, কিন্তু তাঁদের সমর্থন ছাড়া পরিবর্তনও সম্ভব নয়।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কৌশল। আরব দলগুলো সরাসরি সরকারে যোগ না দিয়েও সংসদে আস্থা ভোট, গুরুত্বপূর্ণ আইন এবং নেসেটের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। অর্থাৎ, মন্ত্রিত্ব না নিয়েও ক্ষমতার হিসাবের অংশ হওয়া সম্ভব।
তবে রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের অবস্থান এক নয়। তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য, ধর্মীয় পরিচয় এবং জোটের বিষয়ে শর্ত আলাদা। তাই ১৯টি আসনকে একক রাজনৈতিক ব্লক ধরে নেওয়াও ভুল হবে।
আসল প্রশ্ন হলো, আরবদের সমর্থন ছাড়া সরকার গঠন কঠিন জেনেও ইসরায়েলের বিরোধী নেতারা কি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ভাঙতে পারবেন?
আরবরা কি শেষ পর্যন্ত কিংমেকার হবেন?
ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোর প্রভাব শুধু সরকার গঠনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। নতুন নেসেটের স্পিকার নির্বাচনও তাদের রাজনৈতিক শক্তি পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
জয়েন্ট লিস্টের আহমাদ তিবি জানিয়েছেন, তাঁর দল বর্তমান স্পিকার আমির ওহানাকে সরানোর পক্ষে ভোট দেবে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য বিকল্প সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা করছে। তবে সরকারে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে তারা এখনো অনড়। এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয়, আরব দলগুলো শুধু নেতানিয়াহুকে সরানোর জন্য সমর্থন দিতে চায় না; তারা নিজেদের সমাজের জন্য দৃশ্যমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিশ্রুতিও চাইছে।
অন্যদিকে আইজেনকট সরকার গঠনের জন্য চারটি শর্ত সামনে এনেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলকে ইহুদিদের জন্য একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করা, সামরিক ও বেসামরিক সেবায় অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা, হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা এবং গাজায় হামাসের সামরিক ও শাসনক্ষমতা শেষ করার অঙ্গীকার। এসব শর্ত আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
এখানে একটি বড় রাজনৈতিক বৈপরীত্য রয়েছে। আরব দলগুলোকে সরকার গঠনের আলোচনায় প্রয়োজন হচ্ছে, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও দাবির সঙ্গে ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর নীতিগত দূরত্বও রয়েছে। ফলে আরবদের সমর্থন চাওয়া আর তাদের রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করা এক বিষয় নয়।

আরেকটি সম্ভাবনা হলো, বিরোধী দলগুলো আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠন করতে পারে। এতে আরব দলগুলো মন্ত্রিসভায় না থেকেও সংসদে সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। তবে এমন সরকার কতটা স্থিতিশীল হবে, তা নির্ভর করবে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটে সমর্থন ধরে রাখার ওপর।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুও বসে নেই। তিনি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্যের সরকার গঠনের প্রস্তাব দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে আরব দলগুলোর সমর্থননির্ভর সরকার গঠনের সম্ভাবনা ঠেকানো এবং নিজের নেতৃত্বে নতুন সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু তাঁর বর্তমান জোটের কট্টর ডানপন্থী অংশ এমন সমঝোতা মেনে নেবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন।
শত্রু নয়, ভোটের শক্তি
ইসরায়েলের এই নির্বাচন একটি অস্বস্তিকর রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে এনেছে। দেশটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নাগরিককে প্রতিনিধিত্বকারী আরব দলগুলোকে দীর্ঘদিন সরকার গঠনের মূল রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে রাখা হলেও এবার তাদের ছাড়া ক্ষমতার হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরব নাগরিকদের ভোটে নেতানিয়াহুর জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আসেনি, আবার বিরোধীরাও নিজেদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করতে পারেনি। ফলে আরব দলগুলোর হাতে এখন সংসদীয় দর-কষাকষির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগকে তারা কতটা কার্যকর রাজনৈতিক প্রভাব ও নাগরিক অধিকার আদায়ে ব্যবহার করতে পারবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
এখানে ১৯টি আসনকে শুধু একটি নির্বাচনী সংখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বের নতুন বাস্তবতা। তবে এই প্রতিনিধিত্বের শক্তি কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করবে আরব দলগুলোর নিজেদের মধ্যে সমন্বয়, তাদের দাবির স্পষ্টতা এবং ইহুদি নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার ওপর।
সবচেয়ে বড় কথা, আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ‘শত্রুতা’ বা ‘নিরাপত্তার হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপন করলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও গভীর হতে পারে। আবার তাদের ভোটকে সম্মান করে রাজনৈতিক আলোচনায় জায়গা দিলে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তাহলে কি ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে, যেখানে এত দিন উপেক্ষিত আরব নাগরিকদের সমর্থন ছাড়া ক্ষমতার চাবি ঘোরানো কঠিন হবে?
এখনই আরব দলগুলোকে নিশ্চিত ‘কিংমেকার’ বলা যাবে না। কারণ, তারা সরকারে যোগ দিতে চায় না, আবার তাদের সমর্থনেরও শর্ত রয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট- তাদের ১৯টি আসন এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়।
যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে এত দিন প্রশ্ন ছিল, সেখানেই এবার তাদের ভোট সরকার গঠনের অন্যতম নির্ধারক হয়ে উঠেছে। নেতানিয়াহু থাকবেন, নাকি নতুন সরকার আসবে- তার উত্তর হয়তো শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সেই আরব দলগুলোর ওপর, যাদের রাজনৈতিক শক্তিকে এত দিন ইসরায়েলের ক্ষমতার হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছিল।
তথ্যসূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, রয়টার্স, মিডল ইস্ট আই, দ্য টাইমস অফ ইজরায়েল, হারেটজ, জেরুজালেম পোস্ট এবং আল জাজিরা

