ভারতের ছোট ছোট ফ্ল্যাটে বসে তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার রাজনৈতিক পোস্ট, ভিডিও ও অপপ্রচারের কনটেন্ট। লক্ষ্য কখনো কেনিয়া, কখনো দক্ষিণ আমেরিকা, আবার কখনো যুক্তরাষ্ট্র। অর্থের বিনিময়ে পরিচয় গোপন রেখে ভোটারের মনস্তত্ত্ব বদলে দেওয়ার এই ব্যবসা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন আতঙ্ক। প্রশ্ন হলো, একটি দেশের নির্বাচনের ভাগ্য কি এখন আর সেই দেশের ভোটাররাই নির্ধারণ করছেন, নাকি হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসে থাকা অদৃশ্য ডিজিটাল প্রচারকেরা ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলছেন?
আধুনিক গণতন্ত্রে ভোটারের হাতে ব্যালট থাকলেও তাঁর সিদ্ধান্ত কতটা নিজের- সেই প্রশ্ন এখন নতুন করে সামনে এসেছে। ভারতের আহমেদাবাদের একটি সাধারণ ফ্ল্যাটে বসে ২২ বছর বয়সী রাজন কুমার কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য প্রচারসামগ্রী তৈরি করেছিলেন। দিনে প্রায় ৫০টি পোস্ট, ভিডিও ও পোস্টার তৈরির বিনিময়ে পেতেন মাত্র ৭ ডলার। অথচ তাঁর কাজের প্রভাব পৌঁছে যাচ্ছিল হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের নির্বাচনী মাঠে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়, এসব কনটেন্ট প্রকাশ করা হতো পরিচয় গোপন রাখা অ্যাকাউন্ট থেকে। কখনো বিরোধী নেতার বক্তব্য কেটে বিকৃত করা, কখনো মিথ্যা অভিযোগ, আবার কখনো নারী রাজনীতিকের চরিত্রহননের উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে অপপ্রচার- সবই ছিল পরিকল্পিত প্রচারণার অংশ। ২০২২ সালে উইলিয়াম রুটো কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তবে এসব ভারতীয় প্রচারকের কাজই তাঁর জয়ের কারণ ছিল, এমন প্রমাণ নেই। আসল উদ্বেগ হলো, নির্বাচনী প্রচারে গোপন ও বিভ্রান্তিকর কৌশল কীভাবে একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায় পরিণত হচ্ছে।
গণতন্ত্রের নতুন কারিগর কারা?
একসময় নির্বাচনী প্রচারণা বলতে সভা, মিছিল, পোস্টার, টেলিভিশন বিজ্ঞাপন ও রাজনৈতিক বক্তব্য বোঝানো হতো। এখন সেই জায়গায় যুক্ত হয়েছে অদৃশ্য ডিজিটাল নেটওয়ার্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত অ্যাকাউন্ট একই রাজনৈতিক বার্তা ছড়ালেও বাইরে থেকে মনে হয়, হাজারো সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে একই মত প্রকাশ করছেন।

এখানেই রয়েছে কৌশলটির ভয়াবহতা। ভোটার বুঝতেই পারেন না, তিনি যে ভিডিও দেখছেন, সেটি কোনো স্বাধীন নাগরিকের মতামত, নাকি অর্থের বিনিময়ে তৈরি রাজনৈতিক প্রচারণা। এমনকি মিথ্যা তথ্য বারবার চোখের সামনে আসতে থাকলে সেটিই একসময় সত্য বলে মনে হতে পারে।
আল-জাজিরার অনুসন্ধানে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতিক হেইলি স্টিভেন্সের পক্ষে পরিচয় গোপন রেখে প্রচার চালানো অন্তত ২৮টি অ্যাকাউন্টের তথ্য উঠে এসেছে। এসব অ্যাকাউন্টের ভিডিও ৭০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছিল বলে গবেষকদের দাবি। ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে এসব পোস্ট পরিচালনার প্রমাণও পাওয়া গেছে। তবে এই প্রচারণার সঙ্গে স্টিভেন্সের আনুষ্ঠানিক প্রচারশিবিরের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত নয়।
অর্থাৎ, রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রচারের বাইরেও একটি বিশাল অদৃশ্য প্রচারযন্ত্র কাজ করতে পারে। এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ভোটারকে প্রভাবিত করার এই কৌশল আর পরিকল্পিত প্রতারণার মধ্যে সীমারেখা কোথায়?
ভোটের বাজারে ভারতের উত্থান
ভারতের রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক বিস্তারের পেছনে রয়েছে কম খরচে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির সক্ষমতা। স্থানীয় কর্মী, বিদেশি কোম্পানি, ভিপিএন, ভাড়া করা অ্যাকাউন্ট এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে একটি প্রচারকাজকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করা যায়। ফলে যাঁরা কনটেন্ট তৈরি করছেন, তাঁরা অনেক সময় জানেনও না শেষ পর্যন্ত সেটি কোন দেশের কোন রাজনৈতিক নেতার কাছে পৌঁছাবে।
এখানে আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো অর্থের উৎস আড়াল করা। আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন পরামর্শক দাবি করেছেন, বিদেশি কোম্পানি ও অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে এসব কাজের পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। তবে নির্দিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ প্রমাণিত নয়।
এটি শুধু ভারতের বিষয়ও নয়। বিশ্বজুড়েই রাজনৈতিক প্রচারণার আউটসোর্সিং বাড়ছে। অর্থাৎ, একটি দেশের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের কাজ অন্য দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করানো সম্ভব হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক প্রচারশিবির সহজেই দায় অস্বীকার করতে পারে।

ভোটার স্বাধীন, নাকি অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে?
সবচেয়ে বড় বিপদ এখানেই। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্ত। কিন্তু যদি কোনো ভোটারের সামনে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য, বিকৃত বক্তব্য ও চরিত্রহননের কনটেন্ট হাজির করা হয়, তাহলে তাঁর সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীন থাকে?
কেনিয়ার দুই ভারতীয় রাজনৈতিক পরামর্শক জুলফিকার আহমদ খান ও মোহাম্মদ জায়েদ সামি কিদওয়াইয়ের হত্যাকাণ্ড এই অন্ধকার জগতের ঝুঁকিও সামনে এনেছে। ২০২২ সালের নির্বাচনের আগে তাঁরা নিখোঁজ হন এবং পরে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কেনিয়ার পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিটের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ উঠেছিল। তবে ঘটনাটির সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারের সম্পর্ক এবং দায় নির্ধারণ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া জটিল ছিল; ২০২৬ সালের আগস্টে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট ১৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বাতিল করেন।
এমন বাস্তবতায় বিষয়টিকে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নির্বাচনী স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, নাগরিকের তথ্য অধিকার এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
আজ যদি একটি দেশের ভোটার অন্য দেশের অদৃশ্য প্রচারযন্ত্রের তৈরি বাস্তবতায় সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে আগামী দিনে নির্বাচনের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কে হবেন- জনগণ, রাজনৈতিক দল, নাকি অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ করা ডিজিটাল কারিগরেরা?
গণতন্ত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, প্রচারণাও থাকবে। কিন্তু মিথ্যাকে সত্যের পোশাক পরিয়ে, পরিচয় লুকিয়ে এবং ভোটারের মনস্তত্ত্বকে পরিকল্পিতভাবে প্রভাবিত করে জয় ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা নয়। এটি গণতন্ত্রের ভেতর থেকেই তার ভিত্তিকে দুর্বল করার বিপজ্জনক কৌশল।
ভোটকেন্দ্রে ব্যালটের হিসাব হয়তো নির্বাচন কমিশন করতে পারে। কিন্তু ভোটারের মাথার ভেতরে কতটা প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে, তার হিসাব কে রাখবে?
আল-জাজিরার প্রতিবেদন অবলম্বনে পুনর্লিখিত

