যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছেন দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইরান যুদ্ধ, সামরিক সহযোগিতা এবং একে অপরের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন মিলিয়ে তাঁদের সম্পর্ক এখন নতুন পরীক্ষার মুখে।
একজন চেয়েছিলেন ইরানকে সামরিক শক্তিতে নতজানু করতে, অন্যজন চেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে পাশে রেখে নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করতে। দুই নেতার লক্ষ্য আলাদা হলেও তাঁদের রাজনৈতিক বাজির কেন্দ্র ছিল একই- একে অপরের শক্তি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফল হলো উল্টো! ইসরায়েলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। তাহলে কি দুই নেতার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই তাঁদের রাজনৈতিক বিপদের মুখে ঠেলে দিল? আর ইরান যুদ্ধ কি শেষ পর্যন্ত তাঁদের বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হলো?
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মিত্রতা মানেই সব সময় সমান লাভ? কখনো কখনো একজনের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা অন্যজনের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের সম্পর্কেও এখন সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে এসেছেন, ওয়াশিংটনে তাঁর মতো প্রভাবশালী বন্ধু আর কারও নেই। অন্যদিকে ট্রাম্পও নেতানিয়াহুকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের ঘনিষ্ঠতম মিত্র হিসেবে বিবেচনা করেছেন। কিন্তু দুই দেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফল দেখাচ্ছে, এই ঘনিষ্ঠতার রাজনৈতিক মূল্য এখন দুই নেতাকেই দিতে হচ্ছে।

২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি। অন্যদিকে ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। অর্থাৎ, দুই নেতার রাজনৈতিক অবস্থানই চাপে পড়েছে। তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, নির্বাচনের ফলের সঙ্গে তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্কের সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক এখনো প্রমাণিত নয়। বরং ইরান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ দুই দেশের ভোটারদের কাছে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
বন্ধুত্বের বাজি, ভোটে উল্টো ফল
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশলের বড় অংশজুড়েই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন। ইসরায়েলের সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তির পেছনে ওয়াশিংটনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলের পক্ষে মার্কিন অবস্থান এবং প্রতিবছর প্রায় ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা তার বড় উদাহরণ।
ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নেতানিয়াহুকে সেই সমর্থন ধরে রাখার সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু এবার সমস্যার জায়গা তৈরি হয়েছে ইরান যুদ্ধকে ঘিরে। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে বিদেশি যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থানের কথা বলেছিলেন। অথচ ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করার পর যুক্তরাষ্ট্র নিজেই দীর্ঘ সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়ে।
এখানেই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বাজির প্রশ্ন। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থে প্রয়োজনীয় বলে তাঁর সরকার দাবি করতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কাছে সেই যুদ্ধের মূল্য কী?
জ্বালানির দাম বাড়লে, সরকারি ব্যয় বেড়ে গেলে এবং সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রা কঠিন হলে তারা কি নেতানিয়াহুর সামরিক কৌশলকে নিজেদের স্বার্থের অংশ হিসেবে দেখবেন?
ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের অধ্যাপক শিবলি তেলহামির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মার্কিন ভোটারদের একটি বড় অংশ ইরান যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে নির্বাচনী বিবেচনায় রেখেছেন। তাঁর মতে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ঘনিষ্ঠতা এখন মার্কিন রাজনীতিতে সম্পদ না হয়ে দায়ে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
যে সম্পর্ককে নেতানিয়াহু নিজের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখিয়েছেন, সেটিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠছে।
ছোট মিত্রের প্রভাব, বড় শক্তির বিপদ?
ইসরায়েলের সাবেক সরকারি উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভির মন্তব্যটি এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ‘ছোট মিত্রই যেন বড় শক্তিকে ঘোরাচ্ছে’। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি মধ্যপ্রাচ্যের একটি মিত্রের নিরাপত্তা ও সামরিক অগ্রাধিকারের কারণে নিজেকে আরও বড় সংঘাতে জড়িয়ে ফেলছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।
এটি শুধু ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মিত্রতার সীমা নিয়েও বিতর্ক তৈরি করছে। কোনো ছোট মিত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে বড় শক্তি যদি নিজের অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে ঝুঁকিতে ফেলে, তাহলে সেই সম্পর্কের ভারসাম্য কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
তবে ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে শুধু নেতানিয়াহুর প্রভাবের ফল বলা যাবে না। ট্রাম্প প্রশাসনের নিজস্ব কৌশলগত হিসাব, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থও এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দায় যে বেড়েছে, সেটি অস্বীকার করাও কঠিন।
৩৮০ কোটি ডলারের সহায়তা নিয়েও ধোঁয়াশা
মার্কিন নির্বাচনের দিন ট্রাম্পের একটি মন্তব্য ইসরায়েলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইসরায়েলকে বছরে ৪০০ কোটি ডলারের অর্থায়ন আর দেওয়া হবে না। অথচ দুই দেশের দীর্ঘদিনের সামরিক সহায়তার কাঠামো অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর প্রায় ৩৮০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দিয়ে থাকে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কি সত্যিই সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নাকি মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষ প্রশমনে রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন? এ বিষয়ে বিস্তারিত চুক্তি বা আনুষ্ঠানিক নীতিগত পরিবর্তনের তথ্য স্পষ্ট নয়। তা ছাড়া অর্থসহায়তা কমানো এবং ইসরায়েলের অস্ত্রপ্রাপ্তি সীমিত করা এক বিষয় নয়।
নিউইয়র্কে ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত অ্যালোন পিঙ্কাসের মতে, দুই দেশের সম্পর্ক এখন গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের মুখে। তাঁর উদ্বেগ, অর্থসহায়তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হলেও অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্রের ওপর ইসরায়েলের নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত। এমতাবস্থায় প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন কি ভবিষ্যতে তেল আবিবের সামরিক সিদ্ধান্তগুলোকে আগের মতো নিঃশর্ত সমর্থন দেবে?
দুজনের রাজনৈতিক বিপদ, সামনে কী অপেক্ষা করছে
নেতানিয়াহু এখন ইসরায়েলে সরকার গঠনের কঠিন অঙ্কে আটকে আছেন। তাঁর জোটের ৫৩ আসনের বিপরীতে বিরোধী শিবির ও আরব দলগুলোর সম্মিলিত আসন ৬৭। ফলে আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বিরোধীরা সরকার গঠন করতে পারলে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যে বড় ধাক্কা লাগবে। তবে বিরোধী দলগুলোর আদর্শিক বিভাজন সেই পথ সহজ হতে দিচ্ছে না।
অন্যদিকে ট্রাম্পের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও প্রাতিষ্ঠানিক। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণাধীন কংগ্রেস তাঁর বাজেট, সামরিক ব্যয়, প্রশাসনিক নিয়োগ এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর কঠোর নজরদারি চালাতে পারবে। তদন্ত ও শুনানির মাধ্যমে তাঁর প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার সুযোগও তৈরি হবে।

তবে দুই নেতার পরাজয় মানেই তাঁদের রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়। নেতানিয়াহু এখনো সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। ট্রাম্পও হোয়াইট হাউসে থাকবেন এবং তাঁর হাতে ভেটোসহ সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকবে।
শেষ পর্যন্ত দুই নেতার সবচেয়ে বড় ভুল তাহলে কি ছিল- একে অপরের শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা?
নেতানিয়াহু হয়তো ভেবেছিলেন, ট্রাম্প পাশে থাকলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এবং ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে তাঁকে খুব বেশি রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে না। ট্রাম্পও হয়তো মনে করেছিলেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তাঁর মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং নিজ নিজ দেশের ভোটারদের অসন্তোষ তাঁদের সেই হিসাবকে জটিল করে তুলেছে।

