হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্প, আর কংগ্রেসের দুই কক্ষে বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণ; এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির ময়দানে এবার শুরু হতে যাচ্ছে এক কঠিন ক্ষমতার লড়াই। ডেমোক্র্যাটরা শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের ভুল ধরতে চান না; খরচ, বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এনে তাঁর প্রশাসনকে একযোগে জবাবদিহিতার মুখে দাঁড় করাতে চান। এমনকি ইরান যুদ্ধ থেকে শুরু করে বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ও ওয়াল স্ট্রিটের প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও তদন্তের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তাহলে কি ট্রাম্পের বাকি দুই বছর কাটবে একের পর এক তদন্ত, শুনানি ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পর ডেমোক্র্যাটদের সামনে এখন বড় সুযোগ। এত দিন ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেও ক্ষমতার কাঠামোয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় তাঁদের হাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল। এবার সেই পরিস্থিতি বদলেছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁরা বিভিন্ন কমিটির ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে পারবেন।
তবে এবার ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য শুধু কয়েকটি শুনানি আয়োজন বা কর্মকর্তাদের সমন পাঠানো নয়। তাঁরা এমন একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে চান, যাতে ভোটারদের সামনে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, ব্যয় এবং সম্ভাব্য অনিয়মের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা যায়। অর্থাৎ, ট্রাম্পকে শুধু রাজনৈতিকভাবে বিব্রত করা নয়, তাঁর প্রশাসনের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক চাপ তৈরি করাই হবে মূল কৌশল।
ইরান যুদ্ধ থেকে ওয়াল স্ট্রিট—ট্রাম্পকে ঘিরে ডেমোক্র্যাটদের যত তদন্তের ফাঁদ!
তদন্তের জাল, কোথায় প্রথম আঘাত করবে?

ডেমোক্র্যাটদের পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সমন্বিত তদন্ত। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের বিভিন্ন কমিটি একই বিষয় নিয়ে আলাদাভাবে কাজ না করে নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নিতে চাইছে। এতে একদিকে তদন্তের পুনরাবৃত্তি কমবে, অন্যদিকে বিভিন্ন কমিটির পাওয়া তথ্য একত্র করে প্রশাসনের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে।
তাঁদের পরিকল্পনায় ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মতো বিচ্ছিন্ন শুনানি ও রাজনৈতিক বাকযুদ্ধের পরিবর্তে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হামলা নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির আদলে কাজ করার চিন্তা রয়েছে। সেখানে ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষ্য ব্যবহার করে ঘটনাগুলোর একটি ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল।
এবারও ডেমোক্র্যাটরা এমন সাক্ষ্য ও তথ্য সামনে আনতে চান, যা শুধু ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহল নয়, সাধারণ মার্কিন ভোটারদেরও আগ্রহী করবে।
এখানে হাউস ওভারসাইট কমিটির সম্ভাব্য প্রধান রবার্ট গার্সিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের চার ধাপের পরিকল্পনা করেছেন। তাঁর দুই শব্দের হুঁশিয়ারি- ‘আইনজীবী ধরে রাখুন’– ইতিমধ্যে রাজনৈতিক আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে।
তবে তদন্ত শুরু হলেই কোনো ব্যক্তি অপরাধী প্রমাণিত হন না। অভিযোগের পক্ষে নথি, সাক্ষ্য ও আইনি প্রমাণ প্রয়োজন। ডেমোক্র্যাটদেরও শেষ পর্যন্ত সেটিই দেখাতে হবে।
ইরান যুদ্ধেই কি ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় বিপদ?
ডেমোক্র্যাটদের তদন্ত পরিকল্পনায় সবচেয়ে বিস্ফোরক বিষয় হতে পারে ইরান যুদ্ধ। কারণ, এটি শুধু পররাষ্ট্রনীতি নয়; যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়, প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গেও যুক্ত।
সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটি আগামী জানুয়ারিতে এ যুদ্ধ নিয়ে শুনানির প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি ওয়ার পাওয়ারস রেজুলেশন নিয়ে ভোটের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এখানে ডেমোক্র্যাটদের উদ্দেশ্য শুধু যুদ্ধের ব্যয় কত হয়েছে, তা জানা নয়। তাঁরা জানতে চাইবেন, কোন আইনি ভিত্তিতে সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে, প্রশাসন কংগ্রেসকে কতটা অবহিত করেছে এবং যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে কতটা অগ্রগতি হয়েছে।
সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেনের বক্তব্যেও সেই কঠোর অবস্থান স্পষ্ট। তাঁর মতে, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ বন্ধ করতে কংগ্রেসের হাতে থাকা প্রতিটি কৌশল ব্যবহার করা প্রয়োজন।
তবে কংগ্রেসের তদন্ত বা ওয়ার পাওয়ারস রেজুলেশনের উদ্যোগ মানেই প্রেসিডেন্টের সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নয়। এ ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ক্ষমতা, আইনগত ব্যাখ্যা এবং দুই কক্ষের রাজনৈতিক সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ট্রাম্পের জন্য বিপদ এখানেই- যে যুদ্ধকে তিনি শক্তির প্রদর্শন হিসেবে দেখাতে চান, সেই যুদ্ধের ব্যয় ও বৈধতা নিয়েই যদি কংগ্রেসে তাঁকে জবাব দিতে হয়, তাহলে রাজনৈতিক চাপ কতটা বাড়বে?
বড় করপোরেশনও কি ছাড় পাবে না?
ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের লক্ষ্য শুধু হোয়াইট হাউস বা প্রতিরক্ষা দপ্তরে সীমাবদ্ধ নয়। সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ইতিমধ্যে বিগ টেক কোম্পানির প্রধান নির্বাহী, ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং বৃহৎ করপোরেশনগুলোর প্রতি কঠোর বার্তা দিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য, আইন ভাঙলে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পরিণতি ভোগ করতে হবে। এর মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা বোঝাতে চাইছেন, তাঁদের তদন্ত শুধু ট্রাম্পবিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং ক্ষমতা ও অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ খতিয়ে দেখার বৃহত্তর উদ্যোগ।
তবে এখানেও রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে। তদন্ত যদি নির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালিত না হয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে ডেমোক্র্যাটদের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
ট্রাম্পের সামনে পাল্টা চালের সুযোগ আছে কী?

ট্রাম্পের হাতে এখনো প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। তিনি ডেমোক্র্যাটদের আনা বিলে ভেটো দিতে পারেন। আবার নিজের প্রশাসনের মাধ্যমে বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তও নিতে পারবেন। ফলে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেই হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে হচ্ছে না তাঁকে।
কিন্তু সমস্যা হলো, প্রতিটি তদন্ত, শুনানি ও নথি তলবের সঙ্গে রাজনৈতিক চাপ বাড়বে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়মিত জবাব দিতে হলে নীতিনির্ধারণেও মনোযোগের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
ডেমোক্র্যাটদের জন্যও এটি বড় পরীক্ষা। তাঁরা যদি শুধু ট্রাম্পকে কোণঠাসা করার রাজনীতিতে আটকে যান, তাহলে সাধারণ মানুষের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রত্যাশিত সমাধান দিতে ব্যর্থ হতে পারেন। তাঁদের নিজেদের নেতৃত্বের মধ্যেও নীতিগত মতপার্থক্য রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ডেমোক্র্যাটরা এবার ট্রাম্পকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, কংগ্রেসের জবাবদিহিতার আওতায় থাকা একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মোকাবিলা করতে চাইছেন।
এবারের লড়াই তাই শুধু কে কতটি শুনানি ডাকল, কতটি নথি প্রকাশ করল কিংবা কাকে সমন পাঠাল- তা নিয়ে নয়। আসল পরীক্ষা হবে, ডেমোক্র্যাটরা তদন্তের মাধ্যমে কতটা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সামনে আনতে পারেন এবং সেই তথ্য দিয়ে কতটা কার্যকর রাজনৈতিক ও আইনি পরিবর্তন ঘটাতে পারেন।
ট্রাম্পের সামনে এখনো ভেটোর অস্ত্র আছে, হোয়াইট হাউসও তাঁর নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর তাঁর রাজনৈতিক স্বাধীনতার পরিসর আগের মতো থাকছে না। যে প্রেসিডেন্ট এত দিন নিজের সিদ্ধান্তে বিশ্বরাজনীতির হিসাব বদলাতে চেয়েছেন, এবার তাঁকেই প্রতিটি সিদ্ধান্তের হিসাব দিতে হবে নিজের দেশের কংগ্রেসের কাছে?
তথ্যসূত্র: অ্যাক্সিওস, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান, ফক্স নিউজ, মার্কিন কংগ্রেসের সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটি, হাউস ওভারসাইট কমিটি এবং সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন, এলিজাবেথ ওয়ারেন ও প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়ার বক্তব্য

