যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই জয় শুধু মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তন নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ হিসাবেও। নতুন কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাশিয়া ও ইউক্রেননীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি সামরিক সহায়তা, নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও নির্বাচনের ফলকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। তিনি বলেছেন, ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সমর্থন পেতে চায়। রিপাবলিকানদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটদের ইউক্রেনের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থানের প্রশংসা করেছেন। কিয়েভের পেন্টা থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রধান ভলোদিমির ফেসেঙ্কোর মূল্যায়ন, নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইউক্রেনের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে। তবে দ্বিদলীয় সমর্থন ধরে রাখাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের আমলে কমেছে মার্কিন সহায়তা
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেনের প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বড় ভূমিকা রেখেছিল। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের শেষভাগ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের আর্থিক ও সামরিক সহায়তার পরিমাণ প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর ইউক্রেনের জন্য নতুন মার্কিন সহায়তা অনুমোদন ও সরবরাহের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ইউক্রেন প্রায় ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম পেয়েছে। এর বড় অংশই ছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময় অনুমোদিত সরবরাহব্যবস্থার অবশিষ্ট অংশ। অন্যদিকে জার্মানির কিয়েল ইনস্টিটিউটের হিসাবে, ২০২৫ সালে ইউরোপ প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়ে ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু অস্ত্রের ক্ষেত্রে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর ইউক্রেনের নির্ভরতা এখনো উল্লেখযোগ্য।

এখানেই ডেমোক্র্যাটদের জয় কিয়েভের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা ইউক্রেনের জন্য সামরিক সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারে। বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামের সরবরাহ পুনরায় জোরদার করার দাবি উঠতে পারে।
তবে শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেই ডেমোক্র্যাটরা ইচ্ছামতো সহায়তা পাঠাতে পারবেন না। নতুন বাজেট অনুমোদন, আইন প্রণয়ন এবং প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য ভেটো মোকাবিলার মতো বাধা থাকবে। ট্রাম্পের হাতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা ও নির্বাহী ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশও থেকে যাবে।
রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক নিয়ে তদন্তের চাপ
ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের আরেকটি বড় তাৎপর্য হলো, এবার তারা ট্রাম্প প্রশাসনের রাশিয়াসংক্রান্ত নীতির ওপর সরাসরি নজরদারি চালানোর সুযোগ পাবে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই ডেমোক্র্যাট নেতারা ট্রাম্পের রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তাঁর অবস্থান এবং তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক যোগাযোগ নিয়ে তদন্তের কথা বলেছেন।
নতুন কংগ্রেস ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত শুরু করতে এবং নির্বাহী বিভাগের কাছ থেকে নথি তলব করতে পারবে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসন মস্কোর সঙ্গে কীভাবে আলোচনা করছে, ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হচ্ছে এবং রাশিয়ার প্রতি মার্কিন নীতিতে কোনো বিশেষ ছাড় দেওয়া হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
তবে তদন্তের রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও এর মাধ্যমে সরাসরি ইউক্রেনের জন্য অস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত হবে না। বরং ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়বে এবং রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় তাঁর সিদ্ধান্তগুলো আরও বেশি রাজনৈতিক নজরদারির মুখে পড়বে।
মস্কোও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। রুশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক আন্দ্রেই কোরতুনভের মতে, ডেমোক্র্যাটরা ইউক্রেনকে সরাসরি সামরিক সহায়তা পুনরায় চালু করার দাবি তুলতে পারে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে ইউক্রেন ইস্যুতে ঐক্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে।

ইউক্রেনপন্থী রিপাবলিকানদের পরাজয় কি নতুন সমস্যা?
ডেমোক্র্যাটদের জয় ইউক্রেনের জন্য ইতিবাচক হলেও কংগ্রেসে কিয়েভের সমর্থন যে নিঃশর্তভাবে বেড়ে যাবে, তা নিশ্চিত নয়। কারণ নির্বাচনে ইউক্রেনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা নিজেদের আসন হারিয়েছেন।
এর মধ্যে রয়েছেন পেনসিলভানিয়ার ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক। তিনি কংগ্রেসনাল ইউক্রেন ককাসের সহসভাপতি ছিলেন এবং ইউক্রেনের অন্যতম জোরালো সমর্থক হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া নেব্রাস্কার ডন বেকন ও নিউইয়র্কের মাইক ললারও ইউক্রেনপন্থী রিপাবলিকান হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
অর্থাৎ, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যা বাড়লেও ইউক্রেনের পক্ষে থাকা রিপাবলিকানদের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হারিয়ে গেছে। ফলে কিয়েভের জন্য সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতি হবে, নতুন কংগ্রেসে দলীয় বিভাজনের বাইরে একটি দ্বিদলীয় সমর্থন ধরে রাখা।
এর পাশাপাশি ওয়াশিংটনে ইউক্রেনের নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগও জরুরি হয়ে উঠেছে। সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ওলহা স্টেফানিশিনাকে আগস্টে দায়িত্ব থেকে সরানোর পর যুক্তরাষ্ট্রে কিয়েভের কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ, সামরিক সহায়তার বিষয়ে আলোচনা এবং আইনপ্রণেতাদের ইউক্রেন সফরের আয়োজনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রদূতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের অভিশংসন কি ইউক্রেনের জন্য নতুন বিপদ?
ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার পক্ষেও অবস্থান নিতে পারে। কিন্তু ইউক্রেনের জন্য বিষয়টি উল্টো বিপদ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশটির বিশ্লেষকেরা।
এর পেছনে রয়েছে ২০১৯ সালের ঘটনা। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে অভিযোগ উঠেছিল, তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে জো বাইডেন ও তাঁর ছেলে হান্টার বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। সে সময় ইউক্রেনের জন্য অনুমোদিত প্রায় ৩৯ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তাও আটকে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ট্রাম্প প্রথমবার অভিশংসিত হন।

কিয়েভের বিশ্লেষক ভলোদিমির ফেসেঙ্কোর আশঙ্কা, এবারও যদি ইউক্রেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে, তাহলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কিয়েভের সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্কের অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় চাপে পড়তে পারে কিয়েভ
ডেমোক্র্যাটদের নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগে আগামী দুই মাস ইউক্রেনের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়টিতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ এখনো রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ফলে ট্রাম্প চাইলে এই সময়ের মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে দ্রুত কোনো সমঝোতা প্রতিষ্ঠার জন্য কিয়েভের ওপর চাপ বাড়াতে পারেন।
কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষক ইগর তিশকেভিচের মতে, রাশিয়া যদি কোনো ছাড় দিতে রাজি না হয়, তাহলে দ্রুত যুদ্ধবিরতি বা সংঘাত স্থগিত করার জন্য ট্রাম্পকে ইউক্রেনের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগে ট্রাম্প নিজের নীতির কার্যকারিতা দেখাতে চাইবেন।
এখানেই ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। সামরিক সহায়তা কমে গেলে এবং যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত শান্তিচুক্তির জন্য চাপ দিলে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় কিয়েভের দর-কষাকষির ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসীয় জয় ভবিষ্যতে ইউক্রেনের জন্য নতুন সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির অভিযোগও নতুন কংগ্রেসের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে। মার্কিন সহায়তার অর্থ ও সরঞ্জাম যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিয়ে তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি উঠতে পারে। ফলে কিয়েভকে একদিকে সামরিক সহায়তার জন্য রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য জবাবও দিতে হবে।

পরিশেষে, ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসীয় জয় ইউক্রেনের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, কিন্তু এটিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের নিশ্চিত মোড় পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ট্রাম্প এখনো হোয়াইট হাউসে রয়েছেন এবং পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপও ইতোমধ্যে ইউক্রেনের সহায়তার বড় আর্থিক দায়িত্ব নিয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ডেমোক্র্যাটদের এই রাজনৈতিক জয় কি ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও শক্ত অবস্থানে দাঁড় করাবে, নাকি ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে কিয়েভ আবারও বড় শক্তিগুলোর দর-কষাকষির অংশ হয়ে পড়বে?
প্রধান তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স

