১৯ বছর বয়সী ফাতিমাযারা যখন স্কুলে হাঁটতে বের হন, তখন তার চোখে পড়ে রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা রক্তের দাগ। এই দৃশ্য তার কাছে এখন আর নতুন কিছু নয়। “প্রতিদিন স্কুলে যেতে যেতে রাস্তায় পড়ে থাকা কুকুরের মৃতদেহ দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি,” বলছিলেন মরক্কোর ইফরেন শহরের এই তরুণী।
ইফরেন, যাকে অনেকে “মরক্কোর সুইজারল্যান্ড” বলেন, এখন যেন এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতার নাম। ফাতিমাযারা জানান, “আগে কুকুর মেরে ফেলা হতো মাঝে মাঝে, এখন সেটা নিয়মিত ঘটনা হয়ে গেছে। ওরা যেন শিকার খেলায় নেমেছে—একেকটা কুকুরকে মারছে ঠিক যেমন করে হাঁস শিকার করা হয়।”
বিশ্বকাপের আগেই শহর ‘পরিষ্কার’ করার নামে কুকুর হত্যার হিড়িক
২০২৩ সালে মরক্কোকে ২০৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক হিসেবে ঘোষণা করার পর থেকেই দেশটিতে শুরু হয় রাস্তার কুকুর নিধনের অভিযান। স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে মরক্কোও এই মেগা টুর্নামেন্ট আয়োজনে অংশ নিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পশু কল্যাণ সংস্থা IAWPC-এর প্রধান লেস ওয়ার্ড বলেন, “রাতের আঁধারে বন্দুকধারীরা রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, কুকুরগুলোকে গুলি করে। কিছু কুকুরকে ধরে নিয়ে গিয়ে বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলা হয়। তারা কোথায় যায়, কেউ জানে না।”
ইফরেনের পর্যটন কাউন্সিলের প্রধান ওমর জায়েদ CNN-কে বলেন, “আমরা বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রাস্তাঘাট কুকুরমুক্ত করছি। কুকুরগুলোকে টিকা দিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হচ্ছে।” তবে ফাতিমাযার অভিজ্ঞতা তা বলে না।
২০২৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে গুলির শব্দে জেগে ওঠেন তিনি। বের হয়ে দেখেন পাশের ডাস্টবিনে তিনটি মৃত কুকুর পড়ে আছে—তার পরিচিত এক হাসকি কুকুরও ছিল তাদের মধ্যে। “ওর গায়ে রক্ত লেগে ছিল। আমি তাকিয়ে ছিলাম, কাঁদছিলাম। কিছুই করার ছিল না।”
রক্তের দাগ শুধু কুকুর নয়, মানুষের শরীরেও
শুধু কুকুর নয়, এভাবে চলতে থাকা অভিযান এখন মানুষকেও বিপদের মুখে ফেলেছে।
২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি, বেন আহমেদ শহরে কাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন আবদুররহিম সৌন্নি। হঠাৎ রাস্তা দিয়ে দৌড়ে যাওয়া একটি কুকুরের পেছনে ছোটা গাড়ি থেকে গুলি ছোড়া হয়। তিনটি গুলি কুকুরকে না ছুঁয়ে লাগে সৌন্নির হাঁটু ও উরুতে।
স্থানীয় এক গণমাধ্যমকে তিনি জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর রাস্তায় পড়ে থাকেন। পরে জানা যায়, যে গাড়ি থেকে গুলি ছোঁড়া হয় সেটি ছিল পৌরসভার।
জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নাকি নীতিহীনতার অজুহাত?
মরক্কোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রউদানি জানান, প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ মানুষ কুকুরে কামড় খায়, যাদের ৪০ শতাংশই শিশু। এই ঝুঁকি ঠেকাতে ২০১৯ সালে দেশটি Trap-Neuter-Vaccinate-Release (TNVR) নামে একটি মানবিক কর্মসূচি চালু করে।
তবে সমস্যাটা হলো—এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের নয়, স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষের। রউদানি বলেন, “এখনও অনেক শহর পুরনো পদ্ধতিতেই কুকুর মারছে। আইনের অভাবে এটা বন্ধ করা যাচ্ছে না।”
গোপনে চলছে হত্যা, ভিডিও বলছে সত্য
সিএনএন যাচাই করে জানিয়েছে—মারাকেশ, ক্যাসাব্লাঙ্কা, আগাদির, ইফরেনসহ বহু শহরে কুকুর হত্যার ভিডিও পাওয়া গেছে। ধাতব তার দিয়ে বেঁধে কুকুর গাড়িতে তোলা হচ্ছে। বাচ্চা কুকুরগুলোকেও ফিশিং নেট দিয়ে ধরে ভ্যানে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
এক মার্কিন নাগরিক এরিন ক্যাপটেন, যিনি ক্যাসাব্লাঙ্কায় থাকেন, জানান, “আমি দুটো বাচ্চা কুকুরকে পালছিলাম, টিকাও দিয়েছিলাম। একদিন হঠাৎ দেখি তারা ওদের ধরে নিয়ে গেল। একটাকে লাথি মেরে মেরে মেরে ফেলল, আরেকটার পা ভেঙে দিল।”
FIFA-র প্রতিক্রিয়া: কথা বলছে, কিন্তু কাজ করছে কি?
জানুয়ারি ২০২৩ সালে ইউরোপিয়ান লিঙ্ক কোয়ালিশন (ELC) ফিফার সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি জানায়। তারা ছবি, ভিডিও ও সাক্ষ্যপ্রমাণ তুলে দেয়। ফিফা তখন জানায়, তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং মরক্কোর সঙ্গে কথা বলছে।
কিন্তু তারপর থেকে নীরবতা। ELC দাবি করেছে, এরপর আর ফিফা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফিফা পরে CNN-কে বলেছে, তারা “স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে” এবং “নতুন আইন প্রণয়নের চেষ্টা চলছে।”
জেইন গুডল থেকে শুরু করে রিকি গারভেইস ও পিটার ইগান—অনেকে এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন। সামাজিক মাধ্যমে একে বলছেন “নির্মম গণহত্যা।”
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মিঙ্কি ওয়ারডেন বলেন, “বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা কুকুর ভালোবাসে। বিশ্বকাপের মতো ইভেন্টে এরকম নৃশংসতা মারাত্মক ইমেজ সংকট তৈরি করবে।”

