ইসরাইলের গাজা দখল পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে হামাসকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নির্মূল করা। গত কয়েক দশকে হামাস গাজায় শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং নিয়মিত রকেট হামলা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে ইসরাইলের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। নেতানিয়াহু সরকারের দাবি, এই অভিযান ইহুদিবাদী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য।
এছাড়া গাজায় ইসরাইলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন ধরে দেশটির নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরো গাজা দখলের মাধ্যমে ইসরাইল তার সীমান্ত নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে চায়। নতুন বসতি স্থাপনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনবসতির ওপর প্রভাব বিস্তার করা ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করাও পরিকল্পনার অন্যতম দিক।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে গাজার রাজনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ ইসরাইলের হাতে এসে যাবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে বদলে দিতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সংকট ও সংঘাতের সূত্র হিসেবে দেখছেন।
পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হচ্ছে গাজা শহর দখল এবং বাসিন্দাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি। এর মাধ্যমে ইসরাইল গাজার দক্ষিণাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকা আল-মাওয়াসির মতো স্থানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। এই বাস্তুচ্যুতির ধারা প্রায় দুই মাস বা তারও বেশি সময় ধরে চলবে।
সেনাবাহিনীর সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে ইসরাইলকে অতিরিক্ত রিজার্ভ সৈন্য মোতায়েন করতে হবে। বর্তমানে গাজায় চারটি সামরিক বিভাগ রয়েছে কিন্তু পুরো গাজা দখলের জন্য কমপক্ষে ছয়টি বিভাগের প্রয়োজন। সামরিক অভিযান প্রায় পাঁচ মাস পর্যন্ত চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র অস্থায়ী বেসামরিক অবকাঠামোর মাধ্যমে মানবিক ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করবে। এই অবকাঠামো চালু রাখার মাধ্যমে সাময়িক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং কিছু পর্যায়ে মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। তবে সামরিক ও মানবিক দ্বৈরথ যুদ্ধে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বৃদ্ধি পাবে।
গাজা থেকে প্রায় ছয় লাখ ফিলিস্তিনির জোরপূর্বক উচ্ছেদ ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মী ও সংস্থাগুলোর উদ্বেগের কারণ। বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠী আশ্রয়হীন হয়ে পড়বে, খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবায় ভীষণ সংকটের মুখোমুখি হবে।
গাজার ভেতরে দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি ইতোমধ্যে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ও সামরিক হামলার কারণে জীবনযাত্রা কঠিন। বাস্তুচ্যুতির কারণে শিশু, বৃদ্ধ ও অসহায়রা বিশেষ ঝুঁকিতে পড়বে। আশ্রয় ও পুনর্বাসনের অভাব, মানসিক চাপ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।
মানবিক সংকটের মাত্রা কেবল গাজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, আশেপাশের অঞ্চলেও উদ্বাস্তু সমস্যা বৃদ্ধি পাবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে এই সংকট মোকাবেলায় তৎপর হয়ে উঠেছে, তবে বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী সরঞ্জাম ও জনবলের দিক থেকে সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। বর্তমানে গাজার চারটি সামরিক বিভাগ থাকলেও, পুরো গাজা দখলের জন্য ছয়টি বিভাগের প্রয়োজন। সেনাবাহিনী ক্লান্ত, সরঞ্জাম অভাব ও দীর্ঘস্থায়ী অভিযান চালানো কঠিন।
রিজার্ভ বাহিনীকে দ্রুত একত্রিত করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ। এছাড়া গাজার অবকাঠামোগত ধ্বংস ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় লড়াই কৌশলগত দিক থেকে জটিল। এতে সৈন্য ও সরঞ্জামের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সেনাবাহিনীর মধ্যেও এই পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অনেক সেনা কর্মকর্তা মনে করেন, এই অভিযান দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল হয়ে যাবে, যা মানবিক ও সামরিক ঝুঁকি বাড়াবে।
ইসরাইলের মন্ত্রিসভার ভেতরে কট্টরপন্থী সদস্যদের ভূমিকা গাজা দখল পরিকল্পনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মন্ত্রী স্মোট্রিচ ও বেন-গভির গাজার অস্থায়ী দখলকে স্থায়ী করার এবং সেখানে নতুন ইহুদি বসতি স্থাপনের প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তারা ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে ভূখণ্ডে ইহুদি জনগোষ্ঠী বিস্তারের পক্ষপাতী।
এই প্রবণতা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে এটি ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদের ওপর গভীর আঘাত এবং দুই রাষ্ট্রের সমাধান প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তোলে। কট্টরপন্থী নীতির ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈদেশিক চাপ বাড়তে পারে।
মন্ত্রিসভার এই ধরণের অবস্থান আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়াকে দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে দিতে পারে।
গাজার সম্পূর্ণ দখল মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে। এটি আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াবে, আশেপাশের আরব ও মুসলিম দেশগুলোতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। তেল আবিবের এই পদক্ষেপের ফলে ইসরাইল আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক বুরকু ওজসেলিক উল্লেখ করেছেন- গাজার দখল যুদ্ধের একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ফলে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র স্বীকৃতিতে দ্বিধাগ্রস্ত দেশগুলো সমর্থন থেকে দূরে সরে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইসরাইলের উপর চাপ বাড়বে, তার কূটনৈতিক সম্পর্ক শিথিল হতে পারে। এছাড়া বড় ধরনের প্রতিরোধ ও সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে, যা সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে সংকটে ফেলবে।
গাজা থেকে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি, সামরিক অভিযান এবং বসতি নির্মাণকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার হস্তক্ষেপ দাবি করছেন।
আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা ইসরাইলের এই পদক্ষেপকে যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে তদন্তের আওতায় আনার সম্ভাবনা দেখছেন। এতে আইনি ও নৈতিক জটিলতা বাড়বে।
আইনি বাধ্যবাধকতা এবং মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লেও বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা রয়েছে। তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক সমর্থন ও প্রতিরোধের মুখে ইসরাইলের অবস্থান দুর্বল করতে পারে।
গাজার সম্পূর্ণ দখল মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়াকে কঠিন ও অনিশ্চিত করে তুলবে। এই অভিযান চলমান সংঘাতকে আরও তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী করবে। গাজার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বাড়বে, যা স্থানীয় ও আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়াবে।
সাংঘাতিক সংঘাত ও উগ্রপন্থার বিস্তার ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। শান্তি আলোচনা বাধাগ্রস্ত হবে এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ কঠিন হবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা এই পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। কূটনৈতিক চেষ্টার মাধ্যমে সংঘাত কমানো, মানবিক সাহায্য পৌঁছানো এবং শান্তি প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার প্রয়োজনীয়তা থাকবে।
তবে রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী শান্তি এখন বেশ চ্যালেঞ্জিং মনে হচ্ছে।

