১৯৬১ সালের ১৩ আগস্ট। পূর্ব জার্মানির মানুষ গভীর ঘুমে ছিল কিন্তু সেই রাতটি ছিল তাদের জীবনের জন্য এক অপ্রত্যাশিত মোড়ের রাত। তখন কিছু মানুষ, রাতে অন্ধকারে, কাঁটাতার এবং কংক্রিট ব্যবহার করে এমন একটি প্রাচীর নির্মাণ করছিলেন, যা পূর্ব জার্মানিকে পশ্চিম জার্মানি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়।
প্রাচীর নির্মাণের ফলে অসংখ্য পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব একে অপরের সঙ্গে দেখা করতে পারছিল না। কেউ কেউ চিরতরে তাদের প্রিয়জনদের হারাতে হয়। এই প্রাচীর প্রায় ২৮ বছর দেশকে বিভক্ত রাখে। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলা হয় এবং দুই জার্মানির মানুষ আবারো একত্রিত হতে পারে।
বার্লিন প্রাচীর নির্মাণের পেছনের ইতিহাস ১৯৪৫ সালে শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে জার্মানি মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে। মিত্রশক্তির মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন। যুদ্ধের পরে জার্মানি চারটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্ব নেন, আর সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখে। বার্লিনের রাজধানী শহরও চার ভাগে বিভক্ত করা হয়। পশ্চিম বার্লিন চলে যায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের দখলে এবং পূর্ব বার্লিন সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে আসে।
বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর পূর্ব জার্মানির নারী পশ্চিম জার্মানির নারীকে জড়িয়ে ধরেন। ছবি: রয়টার্স
১৯৪৯ সালের মধ্যে জার্মানি দুইটি আলাদা দেশে বিভক্ত হয়ে যায়। পশ্চিমাঞ্চলীয় অংশকে বলা হয় ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি বা পশ্চিম জার্মানি। সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশকে বলা হয় জার্মান ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক বা পূর্ব জার্মানি। জার্মানি ভাগ হবার পরই স্পষ্ট হয়ে যায়, রাষ্ট্র পরিচালনায় পশ্চিম জার্মানির শাসনব্যবস্থা স্বাধীন এবং উদারতান্ত্রিক ছিল। সেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারত, নিজের পছন্দমতো গান শুনতে পারত এবং মত প্রকাশ করতে পারত। অন্যদিকে পূর্ব জার্মানি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল। মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পুলিশের নজরদারির অধীনে ছিল এবং স্বাধীনতা সীমিত।
জার্মানি ভাগ হবার পর প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পূর্ব জার্মানি থেকে পশ্চিম জার্মানিতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। এটি সোভিয়েত শাসনের জন্য বড় এক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত, ১৯৬১ সালে তৎকালীন সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ নির্দেশ দেন, পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের মাঝখানে একটি প্রাচীর নির্মাণের জন্য। ১৩ আগস্ট রাতের আঁধারে প্রাচীর নির্মাণ শুরু হয়।
প্রথমে কেবল কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে শহরটি বিভক্ত করা হয়। পরে ধীরে ধীরে শক্তিশালী কংক্রিট প্রাচীর তৈরি করা হয়। প্রাচীরের পাশে টহলদারী ও নজরদারি টাওয়ার বসানো হয়, যাতে কেউ প্রাচীর অতিক্রম করতে না পারে। প্রাচীরটি মূলত দুটি সমান্তরাল দেয়াল এবং মাঝখানে ফাঁকা অংশ দিয়ে তৈরি করা হয়। সেই ফাঁকা অংশে সৈন্য মোতায়েন করা হতো। ফাঁকা অংশে মাইনও বসানো হতো, যাতে কেউ সীমান্ত পার হতে না পারে।
বার্লিন প্রাচীরের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার বা ৯৬ মাইল, এবং উচ্চতা ছিল প্রায় ৪ মিটার বা ১৩ ফুট। প্রাচীরে মোট ৩০২টি নজরদারি টাওয়ার ছিল। প্রাচীর দ্রুতই ইউরোপের পশ্চিম ও পূর্ব অংশের বিভেদের প্রতীক হয়ে ওঠে। পশ্চিমা দেশগুলো প্রাচীরকে এক ধরণের কারাগার হিসেবে দেখত, যেখানে পূর্ব জার্মানির মানুষকে সীমিত রাখা হতো। অন্যদিকে সোভিয়েত নেতারা এটিকে ‘সুরক্ষার আবরণ’ বলতেন।
শাবল দিয়ে বার্লিন প্রাচীর ভাঙছেন পূর্ব জার্মানির এক ব্যক্তি। ছবি: রয়টার্স
বার্লিন প্রাচীর নির্মাণের পর পূর্ব জার্মানিতে জীবন কঠিন হয়ে যায়। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ প্রাচীর টপকাতে চেষ্টায় প্রাণ হারায়। অনেক মানুষ পূর্ব বার্লিনে চাকরি হারায়। কঠোর নিয়ম এবং পুলিশের নজরদারি মানুষের দৈনন্দিন জীবন সীমিত করে। পরিবার, বন্ধু ও প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৮০-এর দশকে পূর্ব ইউরোপে স্বাধীনতার আন্দোলন জোরালো হয়। মানুষ আরো বেশি স্বাধীনতা চাইছিল। তারা নিজের পছন্দের গান শুনতে এবং মত প্রকাশ করতে চাইছিল। পূর্ব জার্মানি থেকে শত শত মানুষ প্রতিবেশী দেশ হাঙ্গরি ও চেকোস্লোভাকিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমে পালাতে শুরু করেন। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে পূর্ব বার্লিন সরকারের পক্ষে পশ্চিমে প্রবেশের চেষ্টা আটকানো কঠিন হয়ে ওঠে।
অবশেষে ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর, পূর্ব জার্মানির নেতা টেলিভিশনে একটি ভাষণে ঘোষণা দেন, পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির সীমান্ত খুলে দেওয়া হবে। হাজার হাজার মানুষ প্রাচীরের কাছে জড়ো হন এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে ফটক খোলার জন্য অনুরোধ করেন। সীমান্তরক্ষীরা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে পিছু হটেন। এরপর হাজার হাজার মানুষ পশ্চিম জার্মানিতে প্রবেশ করেন।
বার্লিন প্রাচীর পতনের দিন পূর্ব জার্মানির সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা প্রাচীরের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকে। ছবি: রয়টার্স
প্রাচীরের পতনের দিন, পশ্চিম বার্লিনের মানুষ পূর্ব জার্মানির মানুষের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বহু বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পর পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সঙ্গে জড়িয়ে আনন্দ উদযাপন শুরু হয়। কেউ কেউ প্রাচীরের ওপর উঠে নাচতে থাকেন। ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর বার্লিন প্রাচীর পতিত হয়। তবে প্রাচীর তখনই পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়নি। কয়েক সপ্তাহ ধরে মানুষ হাতুড়ি দিয়ে প্রাচীর ভাঙেন এবং প্রাচীরের টুকরোগুলো স্মৃতিস্বরূপ সংরক্ষণ করেন। ১৯৯০ সালে জার্মান সরকার পুরো প্রাচীর ধ্বংস করে। তবে দর্শনার্থীদের জন্য প্রাচীরের কিছু অংশ এখনও রক্ষিত আছে।
বার্লিন প্রাচীর পতনের পর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি একত্রীকরণের জন্য আলোচনা শুরু করে। প্রাচীর পতনের ১১ মাস পর, ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর, পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে মিলিত হয়ে বর্তমান জার্মানি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। বার্লিন প্রাচীর ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক, যা মানুষকে স্বাধীনতার জন্য লড়াই এবং বিভাজনের ভয়াবহতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
বার্লিন প্রাচীরের ইতিহাস শিক্ষণীয়, কারণ এটি দেখায় কিভাবে রাজনৈতিক বিভাজন এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রাচীর পতন আমাদের শেখায়, মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ও একতা পুনঃস্থাপন সম্ভব, যদি সবাই একসাথে লড়াই করে।