শুক্রবার আলাস্কায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠক শুধু ওয়াশিংটন-মস্কো বা ইউক্রেনেই নয়, ১০ হাজার কিলোমিটার দূরের নয়াদিল্লিতেও গভীর নজরে রাখা হবে। কারণ এই আলোচনার ছায়া ভারতের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পথচলায়ও পড়তে পারে।
উষ্ণতা থেকে শীতলতায়
শীতল যুদ্ধের অবসানের পর থেকে ভারত সমান্তরালে রাশিয়ার সাথে পুরনো বন্ধুত্ব আর আমেরিকার সাথে নতুন ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছে। বিশেষ করে জর্জ বুশ ও বারাক ওবামার সময় যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক দ্রুত উষ্ণ হয়, যা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ ও জো বাইডেনের সময়ও অব্যাহত ছিল। এই ঘনিষ্ঠতার মূল কারণ—চীনের উত্থানকে ভারসাম্য রাখতে ভারতের ওপর আমেরিকার আস্থা। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বাড়তে থাকায় ওয়াশিংটন ভারতের সাথে জোটবদ্ধ হয়, তৈরি হয় কোয়াড—ভারত, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে এক কৌশলগত গ্রুপ।
কিন্তু এখন সেই উষ্ণ সম্পর্ক যেন ঠান্ডা হয়ে এসেছে। ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছেন—যার অর্ধেকই ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার শাস্তি হিসেবে। বাইডেন প্রশাসনই একসময় ভারতকে রাশিয়ার তেল কিনতে উৎসাহ দিয়েছিল, যাতে বৈশ্বিক তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে।
অন্যদিকে, চীন—যে কিনা ভারতের চেয়ে অনেক বেশি রুশ তেল কিনছে—এখন পর্যন্ত কঠোর মার্কিন শুল্কের বাইরে। এর ফলে প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প কি চীনের দিকে নরম, আর ভারতের মতো ঐতিহ্যগত অংশীদারদের সাথে দূরত্ব তৈরি করছেন?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে এক সংবাদ সম্মেলনের সময় হাত মেলাচ্ছেন, ওয়াশিংটন, ডিসি, বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫।
মোদি-ট্রাম্প ব্যক্তিগত সমীকরণের ভাঙন
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি দু’বার জনসভায় মোদির সাথে মঞ্চ ভাগ করেছেন, উষ্ণ আলিঙ্গন বিনিময় করেছেন, একে অপরকে ‘বন্ধু’ বলে ডেকেছেন। কিন্তু এই ব্যক্তিগত সখ্যও শুল্কের ধাক্কা ঠেকাতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এটাই কয়েক দশকে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ধাক্কা।
মাসের পর মাস শুল্ক হুমকি সহ্য করলেও ভারত প্রথমে মুখ খোলেনি। কিন্তু এখন নয়াদিল্লি সরাসরি আমেরিকাকে ‘ভণ্ডামি’র অভিযোগ করছে—বলে যে, যুক্তরাষ্ট্র নিজেও রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য করছে, অথচ ভারতকে দোষ দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংকট গ্রুপের সিনিয়র বিশ্লেষক প্রভীণ দন্তির মতে, এটি শুধু নীতিগত দ্বন্দ্ব নয়—এটি মোদি ও ট্রাম্পের ব্যক্তিত্বের সংঘর্ষও। একসময় S-400 ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্য ভারতকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হলেও, বাইডেন প্রশাসনের সময় সে ঝুঁকি কেটে গিয়েছিল। কিন্তু এখন ট্রাম্পের ‘লেনদেনভিত্তিক’ কূটনীতি ভারতের বহু-মেরুকেন্দ্রিক নীতির সাথে খাপ খাচ্ছে না।
পাকিস্তান ফ্যাক্টর ও অবিশ্বাস
ভারতের কৌশলগত মনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একধরনের সন্দেহ সবসময়ই ছিল—শীতল যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটনের পাকিস্তানপ্রীতি থেকে জন্ম নেওয়া সন্দেহ। সম্প্রতি পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের মার্কিন সফর ও হোয়াইট হাউসে বিরল সাক্ষাৎ সেই সংশয় আরও বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ব্যারাক ওবামা (বাম) এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২৫ জানুয়ারি, ২০১৫ সালে ভারতের নয়াদিল্লীর হায়দরাবাদ হাউসের বাগানে কফি ও চা উপভোগ করছেন।
গত ২৫ বছরে চীনের উত্থান রুখতেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতের প্রতি ধারাবাহিক সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প এসে সেই ‘কৌশলগত উদারতা’তে ধাক্কা দিয়েছেন, যা এখন এশিয়ার অন্যান্য অংশীদারদের মধ্যেও প্রশ্ন জাগাচ্ছে—ওয়াশিংটন কি সত্যিই এই অঞ্চলের মিত্রদের নিয়ে আগের মতো আগ্রহী?
২০১১ সালে ওবামা প্রশাসন চালু করেছিল “পিভট টু এশিয়া” নীতি—যার লক্ষ্য ছিল এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা। কিন্তু ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই যুক্তরাষ্ট্র TPP থেকে সরে আসে, ফলে অর্থনৈতিক দিকটি দুর্বল হয়ে পড়ে। সামরিক সহযোগিতা থাকলেও অর্থনৈতিক বন্ধন আর ততটা দৃঢ় থাকেনি।
ভারতের বিকল্প হিসাব
ভারত যদিও কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক মিত্র নয়, সাম্প্রতিক টানাপোড়েনে তারা নতুন কূটনৈতিক পথ খুঁজছে। এই মাসেই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মস্কো গেছেন, পুতিনের সাথে বৈঠক করেছেন। শিগগিরই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও যাবেন রাশিয়ায়। আগস্টে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসবেন নয়াদিল্লিতে, আর মাসের শেষে মোদি যাবেন সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনে—সাত বছরের মধ্যে চীনে তার প্রথম সফর।
চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং, রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২৩ অক্টোবর, ২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজান-এ অনুষ্ঠিত BRICS ২০২৪ শীর্ষ সম্মেলনের পূর্ণ অধিবেশনের আগে একটি ফটো সেশনে অংশ নিচ্ছেন।
রাশিয়ার প্রস্তাবে ভারত আবারও “রাশিয়া-ভারত-চীন” ত্রয়ী (RIC) মঞ্চে ফিরতে আগ্রহ দেখিয়েছে, যদিও বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি প্রতীকী বেশি, কার্যকর কম—কারণ ভারত-চীন সম্পর্ক এখনো অবিশ্বাসে ভরা।
লাভ-ক্ষতির হিসাব
ট্রাম্প যদি শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়ান, তবে ভারতের ‘কৌশলগত স্বাধীনতা’ বজায় রাখা কঠিন হবে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে রাশিয়া-ইউক্রেন দ্রুত যুদ্ধবিরতিতে যাওয়া—কারণ ট্রাম্প মূলত রাশিয়াকে চাপ দিতে ভারতকে টার্গেট করছেন।
তবে এই শুল্ক সংকট মোদির জন্য ঘরে উল্টো রাজনৈতিক লাভও আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তিনি নিজেকে জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকারী নেতার ভূমিকায় তুলে ধরতে পারবেন—বিশেষ করে কৃষিখাত নিয়ে মার্কিন চাপ প্রত্যাখ্যান করে তিনি ইতিমধ্যেই বলেছেন, “ভারতের কৃষকের স্বার্থ আমি কোনো মূল্যে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেব না, ব্যক্তিগত মূল্য দিতে হলেও।”
সবশেষে বিশ্লেষকদের মত, ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়বে না, কিন্তু আগের উষ্ণতা ফেরার সম্ভাবনা কম। আপসের মাধ্যমে সম্পর্ক সামলে তোলা সম্ভব হলেও বিশ্বাস ও বন্ধুত্বের ঘাটতি বেশ কিছুদিন স্পষ্ট থাকবে।