বিগত কয়েক বছর ধরে দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষার জন্য ব্যয় হয়েছে ৬৬ কোটি ২০ লাখ ডলার—বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৭৯ কোটি (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসেবে)। শুধু ব্যয় নয়, সংখ্যার দিক থেকেও এখন বিদেশগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
ইউনেস্কোর ‘গ্লোবাল ফ্লো অব টারশিয়ারি লেভেল স্টুডেন্টস’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫২ হাজার ৭৯৯ শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য গেছেন ৫৫টি দেশে। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ১৫১ এবং ২০১৩ সালে ছিল ২৪ হাজার ১১২ জন। অর্থাৎ এক দশকে সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষাকে বিদেশে স্থায়ী হওয়ার পথ হিসেবে ব্যবহার করছেন, এবং অধিকাংশই আর দেশে ফিরছেন না।
ডেনমার্কের অ্যালবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশে স্নাতক শেষে চাকরিতে ১৫ হাজার টাকার বেতন মেলে, কিন্তু বিদেশে একই ডিগ্রিতে পাওয়া যায় কয়েকগুণ বেশি। এখানকার জীবনের নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনই আমাকে স্থায়ী হতে প্রলুব্ধ করছে।”
জার্মানির নিদারাইন ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সের সুমাইয়া রশিদ মনে করেন, জার্মানিতে শিক্ষা ও চাকরির সুযোগের মধ্যে সরাসরি সংযোগ রয়েছে, যা বাংলাদেশে নেই।
বুয়েটের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বলেন, “তরুণদের দেশ ছাড়ার পেছনে প্রধান কারণ কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা। প্রকৃত শিল্পায়ন না হওয়ায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। শিল্পক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে তরুণদের দেশে রাখা সম্ভব হবে না।”
‘ওপেন ডোরস রিপোর্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৯৯ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬% বেশি। গত এক দশকে এ সংখ্যা ২৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বিদেশে শিক্ষার ব্যয় ২০২০-২১ অর্থবছরের ২৪ কোটি ৩১ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৬৬ কোটি ২০ লাখ ডলারে—পাঁচ বছরে আড়াই গুণের বেশি বৃদ্ধি। শুধু গত অর্থবছরেই আগের বছরের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১২ কোটি ৮৮ লাখ ডলার।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ মনে করেন, বিদেশগামী শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বে পৌঁছালে তা দেশের জন্য ইতিবাচক হবে। তবে শিক্ষার্থীদের দেশে রাখার জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন।
শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেন, “এটি শিক্ষার্থীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত। তবে দেশীয় শিক্ষার মান উন্নত করে বিদেশে পড়াশোনার প্রবণতা কমানো সম্ভব। বিদেশে যাওয়া সবসময় ব্রেইন ড্রেইন নয়; সঠিকভাবে সংযুক্ত করা গেলে তা ব্রেইন সার্কুলেশনে পরিণত হতে পারে।”
তিনি আরো বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব, নির্যাতন ও হয়রানি শিক্ষার্থীদের বিদেশে যেতে প্ররোচিত করছে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যেন শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারে।”

