১৯৪৭ সালের শুরুতে ব্রিটিশ শাসনভার দ্রুত সমাপ্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়। দিল্লির ঐতিহাসিক ভাইসরয়েস হাউস—যা আজকের রাষ্ট্রপতি ভবন—তখন ছিল ভারতের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্র। এখানে বসেই ব্রিটিশ ভাইসরয়রা পুরো উপমহাদেশ পরিচালনা করতেন।
লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্বাধিনায়ক ছিলেন, তাঁকে শেষ ভাইসরয় হিসেবে নিয়োগ দেয় ব্রিটিশ সরকার। ১৯৪৭ সালের ২২ মার্চ তিনি দিল্লিতে এসে দায়িত্ব নেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলির ঘোষণামতে, জুন ১৯৪৮-এর মধ্যে ক্ষমতা ভারতীয়দের হাতে তুলে দিতে হবে। কিন্তু মাউন্টব্যাটেনের লক্ষ্য ছিল সময়সীমা আরও এগিয়ে এনে শান্তিপূর্ণ ও দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করা।
তিনি প্রথম দিন থেকেই রাজনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক শুরু করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর মাউন্টব্যাটেন বুঝতে পারেন, ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ নিয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে মতপার্থক্য চরমে পৌঁছেছে। মহাত্মা গান্ধী অহিংস আন্দোলনের পথ ধরে একটি ঐক্যবদ্ধ ভারতের পক্ষে ছিলেন, তবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জোর দিচ্ছিলেন মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র ‘পাকিস্তান’-এর উপর।
প্রতিদিন ভাইসরয়েস হাউসে নেহরু, প্যাটেল, আবুল কালাম আজাদ, লিয়াকত আলী খানসহ দুই দলের নেতাদের উপস্থিতিতে দীর্ঘ বৈঠক চলত। ব্রিটিশ প্রশাসনও এসব বৈঠকে উপস্থিত থেকে রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজত।
এ সময় পাঞ্জাব ও বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল, যা দেশভাগের সিদ্ধান্তে চাপ বাড়ায়। মাউন্টব্যাটেন একদিকে দাঙ্গা থামানোর চেষ্টা চালালেও অন্যদিকে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করছিলেন।
১৯৪৭ সালের ২৬ জুলাই ভাইসরয়েস হাউসে গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠক বসে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, লর্ড মাউন্টব্যাটেন করাচি সফরে যাবেন পাকিস্তানের নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার জন্য। করাচি তখন পাকিস্তানের ঘোষিত রাজধানী।
বৈঠকে সফরের সূচি ও প্রোটোকল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ঠিক হয়, পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের কিছুদিন আগে করাচি গিয়ে তিনি জিন্নাহ ও তাঁর মন্ত্রিসভার সঙ্গে বৈঠক করবেন, স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো গঠনে সহযোগিতার প্রস্তাব দেবেন।
‘মাউন্টব্যাটেন পেপার্স’—যা বর্তমানে ব্রিটিশ আর্কাইভে সংরক্ষিত—সেখানে এই বৈঠকের মিনিটস স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। এই সফরকে অনেক ইতিহাসবিদ স্বাধীনতার পূর্বপ্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন।
মাউন্টব্যাটেন করাচি পৌঁছালে শহরজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। বিমানবন্দরে সামরিক বাহিনীর গার্ড অব অনার, শহরের রাস্তায় ব্যানার-পোস্টার এবং হাজার হাজার মানুষের ভিড় দেখে বোঝা যাচ্ছিল পাকিস্তান তাদের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে সফরের পেছনে নিরাপত্তা ঝুঁকিও ছিল। জিন্নাহর সামরিক সচিব পরবর্তীতে জানান, গোয়েন্দা সংস্থার হাতে তথ্য ছিল—করাচিতে মাউন্টব্যাটেনের ওপর বোমা হামলার চেষ্টা হতে পারে। এজন্য তাঁর যাতায়াত ও অনুষ্ঠানস্থলে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জনতার ভিড়ে মাউন্টব্যাটেন কিছুটা বিস্মিত হলেও স্বভাবসুলভ হাসি ও কূটনৈতিক ভঙ্গিতে সবাইকে অভিবাদন জানান।
করাচিতে প্রথম আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল পাকিস্তানের নবগঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে যোগ দেওয়া। সেখানে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন সংশোধনের প্রস্তাব তোলা হয়, যা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করবে। মাউন্টব্যাটেন এতে কিছু কূটনৈতিক পরামর্শ দেন।
সেদিন রাতে গভর্নর জেনারেলের সরকারি বাসভবনে রাজকীয় ভোজসভার আয়োজন করা হয়। পরিকল্পনা ছিল, ভোজের আগে সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা বিনিময় হবে। কিন্তু বাস্তবে জিন্নাহ দীর্ঘ রাজনৈতিক বক্তৃতা শুরু করেন, যা মাউন্টব্যাটেনকে কিছুটা অপ্রস্তুত করে দেয়।
তবে তিনি তাৎক্ষণিক কৌশলী ভাষণে পরিস্থিতি সামলে নেন এবং পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে সৌহার্দ্য বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন। ইতিহাসবিদদের মতে, ওই ভোজসভা ছিল পাকিস্তান-ভারতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের এক ধরনের ‘টোন সেটার’।
লর্ড মাউন্টব্যাটেনের করাচি সফরে নিরাপত্তা ছিল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে। পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ায় আশঙ্কা ছিল সন্ত্রাসী হামলার। করাচি বন্দরের চারপাশে নৌবাহিনীর পাহারা জোরদার করা হয়, আকাশপথে বিমান টহল চলতে থাকে।
বিমানবন্দর থেকে শহরের কেন্দ্র পর্যন্ত প্রধান সড়কগুলো আগেভাগেই বন্ধ করে সামরিক ও পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। সফরের প্রতিটি ধাপে ‘ক্লোজ প্রোটেকশন ইউনিট’ মাউন্টব্যাটেন ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছিল।
প্রটোকল অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে আসা ব্রিটিশ ও ভারতীয় কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা কনভয়ের ব্যবস্থা করা হয়। মাউন্টব্যাটেন ছিলেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য, তাই প্রটোকলের স্তর ছিল রাজকীয় সফরের সমান।
করাচিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও লর্ড মাউন্টব্যাটেনের একান্ত বৈঠক। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল দুই রাষ্ট্রের জন্মের আগে শেষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, যাতে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তোলা যায়।
বৈঠকে আলোচিত প্রধান বিষয়গুলো ছিল—
- ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পদের বণ্টন
- সীমান্ত নির্ধারণ কমিশনের কাজ
- সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও প্রশাসনিক কর্মচারী ভাগ
- সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রোধে যৌথ পদক্ষেপ
জিন্নাহ জোর দিয়ে বলেন- পাকিস্তান হবে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র, যা ভারতের কোনো অভ্যন্তরীণ বা পররাষ্ট্র নীতির অধীন থাকবে না। মাউন্টব্যাটেন এই অবস্থানকে সম্মান জানান, তবে তিনি দুই দেশের মধ্যে অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন।
বৈঠক শেষে উভয়েই সাংবাদিকদের বলেন, তারা ভবিষ্যতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
রাজনৈতিক বৈঠকের পাশাপাশি মাউন্টব্যাটেন করাচিতে কয়েকটি জনসম্পৃক্ত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। স্থানীয় স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বাধীনতার স্বপ্ন ও পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরে নানা পরিবেশনা করে।
মাউন্টব্যাটেন করাচি জাদুঘর পরিদর্শন করেন এবং সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “এই ঐতিহ্য প্রমাণ করে, পাকিস্তান ও ভারত উভয়ের শিকড় হাজার বছরের ইতিহাসে প্রোথিত।”
তিনি কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক ও লেখকের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় অংশ নেন, যেখানে মুক্ত গণমাধ্যমের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। এ ধরনের জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি ব্রিটিশ কূটনীতির একটি কৌশল ছিল, যা জনমতকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে সহায়তা করত।
ইতিহাসবিদদের মতে, মাউন্টব্যাটেনের করাচি সফর পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কের প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করেছিল, যদিও পরে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বন্দ্ব বেড়ে যায়।
এই সফরের ফলাফল হিসেবে—
- উভয় দেশ সম্পদ ও সামরিক বাহিনী ভাগাভাগির প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে একমত হয়।
- সীমান্ত নির্ধারণ কমিশনের কাজ দ্রুত এগোয়।
- পাকিস্তান সরকার ব্রিটিশ কমনওয়েলথে যোগদানের প্রাথমিক আগ্রহ প্রকাশ করে।
তবে এই সফরে যে পারস্পরিক সৌহার্দ্যের বার্তা দেওয়া হয়েছিল, তা পরবর্তী মাসগুলোতে দাঙ্গা, শরণার্থী সংকট এবং কাশ্মীর ইস্যুর কারণে অনেকটাই ক্ষয়ে যায়।
আজকের ইতিহাসবিদরা করাচি সফরকে দেখেন এক প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবে—যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বশেষ প্রতিনিধি দুটি নবজাত রাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সেতুবন্ধন গড়ার চেষ্টা করেছিলেন।
মাউন্টব্যাটেনের ব্যক্তিত্ব, কূটনৈতিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা হয়তো কিছুদিনের জন্য পরিস্থিতি নরম করেছিল, কিন্তু গভীর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও জনগণের মধ্যে জমে থাকা অবিশ্বাস এক সফরে মেটানো সম্ভব ছিল না।
পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের মাত্র কয়েকদিন আগে হওয়ায় এই সফর ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে। এটি ব্রিটিশদের ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি চূড়ান্ত ধাপ এবং একই সঙ্গে ভারতবর্ষের দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার বাস্তব স্বীকৃতি ছিল।
এই সফর থেকে পাওয়া শিক্ষা হলো—যখন রাজনৈতিক বিভাজন গভীর হয়, তখন কূটনৈতিক সৌজন্য শুধু সময়িক প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান গড়ে তুলতে পারে না।

