দুটি দেশের প্রকৃত উদ্বেগ বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায়—শুনা নয়, খেয়াল করা কোন শব্দ তারা বারবার একসাথে ব্যবহার করতে চায় না। ইরান ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সেই শব্দগুলো হলো ‘বাণিজ্য’ ও ‘নিরাপত্তা’। আর যখন বাণিজ্যের সঙ্গে নিরাপত্তা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকে, বোঝা যায় মূল চালিকা শক্তি বাণিজ্য নয়।
কাগজে-কলমে তেহরান ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ জোট হিসেবে পরিচিত। তারা প্রায় ৯০০ কিলোমিটার সীমান্ত ভাগাভাগি করে, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ শেয়ার করে এবং কিছু সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মিল আছে। তবে বাস্তবতা আলাদা—দূরত্ব, সন্দেহ এবং অস্থায়ী সহযোগিতাই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। সাধারণত সমস্যা সমাধান বা কোনো সাধারণ হুমকি এড়াতে দুই দেশ একসঙ্গে আসে।
সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা গেছে, পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব—যার নেতৃত্বে আছেন চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল আসিম মুনির—হঠাৎ ইরানের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেছে। ফেব্রুয়ারিতে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত উত্তেজনার সময় ইরান পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ায়। এপ্রিল মাসে পাকিস্তান ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক হামলার প্রতিবাদ জানায়। প্রথম দর্শনে এগুলো ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্কের মতো মনে হলেও বাস্তবতা জটিল।
এই পরিস্থিতি বোঝার জন্য ফিরে যেতে হবে ১৯৭৯ সালে। ইরানের ইসলামি বিপ্লব শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে, যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষুব্ধ করে এবং একটি বিপ্লবী শিয়া ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। সঙ্গে সঙ্গে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং সুন্নি ইসলামের প্রভাবক, মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অর্থায়ন শুরু করে।
পাকিস্তান এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে ওঠে। ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে তেহরান ও রিয়াদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেও বাস্তবতা ছিল জটিল। ১৯৯০-এর দশকে দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। সৌদি অর্থায়নে পরিচালিত উগ্র সুন্নি গোষ্ঠী শিয়াদের টার্গেট করে, আর জবাবে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তারা পাকিস্তানে শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন করছে। ভ্রাতৃত্বের মুখোশের আড়ালে চলে বিপজ্জনক প্রক্সি যুদ্ধ।
ফলাফল: হাজার হাজার প্রাণহানি, সামাজিক আস্থার ক্ষয় এবং গভীর সাম্প্রদায়িক বিভেদ—যা আজও পুরোপুরি নিরাময় হয়নি। পাকিস্তান ও ইরানের ‘উষ্ণ’ সম্পর্ক মূলত লেনদেনভিত্তিক। নিরাপত্তার কারণে একে অপরের ওপর নির্ভরতা থাকলেই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। মুসলিম ঐক্যের কোনো বাস্তব যৌথ স্বপ্ন দেখা যায়নি।
২০১৮ সালে ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হলে ঘোষণা দেন, তার লক্ষ্য দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ইরানকে মুসলিম বিশ্বের পুনর্জাগরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করেন, বিশেষ করে পাকিস্তানকে ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় রাজতন্ত্রের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে।
ইমরানের শাসনামলের সময় আঞ্চলিক অস্থিরতা তীব্র হয়। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আমেরিকার ড্রোন হামলায় ইরানি জেনারেল কাসেম সুলাইমানি নিহত হন। পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।
ইমরান খান তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা উন্নত করলেও, ২০২২ সালের এপ্রিলে তার ক্ষমতাচ্যুতি বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিকল্পনাকে থামিয়ে দেয়। এটি দেখা হয় ওয়াশিংটন সমর্থিত ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর অংশ হিসেবে, যা পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক নেতৃত্বের তত্ত্বাবধানে ঘটে। সেনাবাহিনী ইমরানের স্বাধীন মনোভাব নিয়ে অস্বস্তিতে ছিল।
এরপর জেনারেল আসিম মুনির দায়িত্ব নেন—একজন নেতা, যিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অথচ অদ্ভুতভাবে, তিনি এখন ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলছেন। হাসি, করমর্দন, চায়ের কাপ বিনিময় এবং ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির’ প্রেস কনফারেন্স—সবই চোখে সুন্দর লাগে। কিন্তু আসল আলোচনার বিষয় হলো নিরাপত্তা, এবং দুই পক্ষই তা ভালোভাবে জানে।
ইরানের অবস্থান বহু দশক ধরে স্পষ্ট: তারা চায় পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো লড়াইয়ে জড়াবেন না। পাকিস্তানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক কার্যক্রম চালাতে দেবেন না। নিজেদের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করতে দেবেন না।
এটি কোনো তাত্ত্বিক আশঙ্কা নয়। তেহরান মনে রেখেছে ২০০০-এর দশকে কিভাবে ওয়াশিংটন পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশকে ইরানবিরোধী অভিযানের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিল। এর মধ্যে ছিল ইরানি বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা, মুজাহেদিন-ই-খালেক (এমইকে)-এর গোপন সমর্থন এবং ইরানের অভ্যন্তরে সমস্যা সৃষ্টির জন্য অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহায়তা।
পরবর্তী সময়ের পরিণতি আরও জটিল। একই নেটওয়ার্কের কিছু অংশ পাকিস্তানকেই লক্ষ্যবস্তু বানায়। ৯/১১-এর পর আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী কেবল ইরানের ওপর চাপ তৈরির জন্য নয়, পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করতে এবং ওয়াশিংটনের কৌশলগত উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
ইরান এই দ্বিমুখী খেলাটি অনেক আগে বুঝে গিয়েছে। বাস্তববাদী তেহরান প্রো-আমেরিকান নেতৃত্ব থাকলেও ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে সম্পর্কেও কিছু স্পষ্ট ‘রেড লাইন’ রয়েছে।
পাকিস্তানের প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত বেলুচিস্তানে দেশের মোট জনসংখ্যার ছয় শতাংশের কম মানুষ বাস করে। তবুও এটি ইসলামাবাদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ সম্পদ এবং কৌশলগত উপকূলরেখা থাকা সত্ত্বেও বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে অনুন্নত এবং রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন অঞ্চল।
বেলুচিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ আসলে পশতুন; বেলুচ নয়। তবুও দীর্ঘ দশক ধরে অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং কঠোর সামরিক অভিযানের কারণে বেলুচ জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহই সংবাদ শিরোনামে জায়গা করে নিয়েছে।
ইরানের দৃষ্টিতে বেলুচিস্তান একটি যৌথ দুর্বলতা। পাকিস্তানি বেলুচিস্তানের সন্নিহিত ইরানি সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে সুন্নি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো হামলার শিকার হয়েছে। তেহরান অভিযোগ করে, এই গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র ও অর্থ প্রায়শই পাকিস্তানি ভূখণ্ডের মাধ্যমে বিদেশি শক্তি থেকে আসে।
ইরান–পাকিস্তান সম্পর্কের হঠাৎ ঘনিষ্ঠতা কোনো শূন্যতায় ঘটছে না। মধ্যপ্রাচ্য এখন উত্তেজনায় টানটান। গাজায় গণহত্যা দীর্ঘায়িত হয়েছে, ইরান ও ইসরায়েল ক্রমশ সরাসরি হামলা চালাচ্ছে, আর যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরজুড়ে নতুন করে সেনা মোতায়েন করছে। তেহরান স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে—যদি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বাধে, প্রতিবেশী দেশগুলোকে, বিশেষ করে যাদের সঙ্গে মার্কিন সামরিক সম্পর্ক রয়েছে, নিজেদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
দীর্ঘ সীমান্ত এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন অভিযানের ইতিহাসের কারণে পাকিস্তান তেহরানের নজরদারির শীর্ষে। জেনারেল মুনির সুবিধাজনক সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মেলাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও, পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব মোটেও ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চায় না। বিশেষ করে যখন দেশটি রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল, অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকির মুখে।
সুতরাং ‘বাণিজ্য আলোচনা’ ও ‘যৌথ প্রকল্প’ নিয়ে যত আড়ম্বরপূর্ণ ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো মূলত আস্থার পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টা। এক ধরনের ‘কূটনৈতিক বিমা’, যাতে আঞ্চলিক যুদ্ধ হলে পাকিস্তান ইরানের লক্ষ্য তালিকা থেকে বাদ থাকে।
মুসলিম ঐক্যের যত উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা দেওয়া হোক না কেন, ইরান–পাকিস্তান সম্পর্ক কখনোই অটল ভ্রাতৃত্বের ওপর দাঁড়ায়নি। এটি মূলত ভৌগোলিক সান্নিধ্য সামলানোর বিষয়। দুই পক্ষই জানে—একজনকে বঞ্চিত করলে ঝুঁকি আছে কিন্তু কেউই পারস্পরিক অবিশ্বাসের ইতিহাস ভুলে যায়নি। ইরান জানে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পাকিস্তান জানে, ইরান তাদের সীমান্তে এমন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে যা প্রয়োজনে সমস্যার উৎস হতে পারে।
কূটনীতিকেরা ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি’ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবেন, কারণ সেটাই নিরাপদ বক্তব্য। তবে সত্য হলো, এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে ‘ভ্রাতৃত্ব’ প্রায়শই মরুভূমির ওপর ভাসমান মরীচিকার মতো। কাছে গেলে দেখা যায়, এটি আসলে পারস্পরিক সন্দেহ, ঐতিহাসিক ক্ষোভ এবং বাস্তবমুখী হিসাবনিকাশের রূঢ় জমি।
পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব হয়তো ভাবছেন, ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা এবং তেহরানের সতর্কবার্তার মধ্যে ভারসাম্য রাখা যাবে। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, ৯০-এর দশকের সাম্প্রদায়িক রক্তপাত থেকে বেলুচিস্তানের ছায়াযুদ্ধ পর্যন্ত, এই অঞ্চলে যদি কেউ একসঙ্গে দুই ‘মাফিয়া ডন’-এর সঙ্গে কাজ করতে চায়, দুজনই একসময় আনুগত্যের প্রমাণ চাইবে। তখন ‘বাণিজ্য’ কারও চিন্তাতেই থাকবে না।

