শুক্রবার ছয় দফা আলোচনার পরও জাতিসংঘের প্লাস্টিক উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ উদ্যোগ ভেঙে পড়েছে। এর ফলে দূষণ মোকাবিলার আশা কমে গেছে এবং অনেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের সময় বৈশ্বিক চুক্তি নিয়ে হতাশ হয়েছেন।
গত তিন বছর ধরে সমুদ্র দূষণ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্লাস্টিক রোধে একটি বাধ্যতামূলক বৈশ্বিক চুক্তি করতে যে প্রচেষ্টা চলছিল, তা এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে বলে জানিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা।
অনেক দেশ ও পরিবেশকর্মীরা ব্যর্থতার জন্য দায়ী করছেন তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন প্লাস্টিক উৎপাদন সীমিত করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে, যা পলিমার উৎপাদন কমাতে পারত।
পানামার আলোচক ডেব্রা সিসনেরোস জানান- বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্লাস্টিক উৎপাদক যুক্তরাষ্ট্র—যা বাইডেন প্রশাসনের সময়ে তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত ছিল—এইবার সম্পূর্ণ অনমনীয় অবস্থান নিয়েছে। “এইবার তারা কিছুই চাইছিল না। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারা আমাদের বিপক্ষে ছিল।”
পরিবেশকর্মীরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে ওয়াশিংটনের অবস্থান বদলাবে না। কারণ, ট্রাম্প ফেব্রুয়ারিতে প্লাস্টিক স্ট্র ব্যবহার উৎসাহিত করার একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। আইপিইএন নেটওয়ার্কের আন্তর্জাতিক সমন্বয়ক বিয়র্ন বিলার বলেন, “তাদের মানসিকতা ভিন্ন। তারা মাটি থেকে আরও তেল ও গ্যাস তুলতে চায়।”
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি। তবে আগে তারা জানিয়েছিল, প্রতিটি দেশকে নিজ নিজ প্রেক্ষাপটে ব্যবস্থা নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, নতুন নিয়ম সব ধরনের প্লাস্টিক পণ্যের দাম বাড়াবে। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে জলবায়ু ও পরিবেশ সংক্রান্ত বেশ কিছু নীতি প্রত্যাহার করেছে, যা তারা শিল্পের ওপর ‘অতিরিক্ত বোঝা’ বলে মনে করে।
প্রায় ১০০ দেশের জোট জেনেভায় একটি উচ্চাভিলাষী চুক্তি চেয়েছিল, যেখানে উৎপাদন সীমা ছিল মূল দাবি। ফিজির প্রতিনিধি সিভেন্দ্রা মাইকেল বলেন, উৎপাদন সীমা বাদ দেওয়া মানে “নল খোলা রেখেই মেঝে মুছতে থাকা।”
বিশ্ব বন্যপ্রাণী ফান্ড (WWF) জানায়- প্রতিটি মাসের বিলম্বে প্রায় ১০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমে, যার কিছু দ্বীপরাষ্ট্রের সৈকতে গিয়ে ভিড়ছে।
কিছু প্রতিনিধি আলোচনার আয়োজক আন্তর্জাতিক আলোচনাকারী কমিটি (INC) ও জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) সমালোচনা করেছেন। বৃহস্পতিবার রাত ১২টার আগে শেষ বৈঠকটি মাত্র এক মিনিট স্থায়ী হয়ে স্থগিত হয়, যা হাসি-ঠাট্টা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। ফ্রান্সের পরিবেশমন্ত্রী একে ‘অগোছালো’ বলে বর্ণনা করেছেন।
আইএনসি চেয়ারম্যান লুইস ভায়াস বলেন- “দেশগুলোর মধ্যে বিভক্তি বড় সমস্যা। তবে কিছু অগ্রগতি হয়েছে।” কিন্তু জাতিসংঘের প্রক্রিয়ায় সর্বসম্মতি প্রয়োজন—যা অনেকের মতে কার্যত অসম্ভব, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের মতো বহুপাক্ষিকতা-বিরোধী প্রশাসনের সময়ে। আইপিইএনের বিলার বলেন, “সর্বসম্মতি মৃত। প্লাস্টিক ও তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো যদি শর্ত ঠিক করে, তবে কোনো কার্যকর চুক্তি সম্ভব নয়।”
কিছু প্রতিনিধি ভোটাভুটির প্রস্তাব দিয়েছেন বা জাতিসংঘের প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে আলাদা চুক্তির কথা বলেছেন। WWF ও অন্যান্য সংস্থা চেয়েছে, উচ্চাভিলাষী দেশগুলো আলাদা চুক্তি করুক এবং পরে উৎপাদনকারী দেশগুলোকে যুক্ত করার চেষ্টা করুক।
আলোচনায় দুটি খসড়া প্রস্তাব উঠে এসেছে—একটি উচ্চাভিলাষী, অন্যটি কম শক্তিশালী। কোনোটিই গৃহীত হয়নি। পরবর্তী বৈঠকের তারিখও নির্ধারিত হয়নি।
তবে ইতিবাচক দিক হলো—বিশ্বের শীর্ষ প্লাস্টিক উৎপাদক চীন প্রথমবার প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে প্লাস্টিকের পুরো জীবনচক্র মোকাবিলা করতে হবে। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল ল-এর ডেভিড আজুলাই একে “আশাব্যঞ্জক নতুন দরজা” হিসেবে দেখছেন।

