ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের নতুন ডিজিটাল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে। আগামী ১২ অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে শুরু হবে ‘এন্ট্রি–এক্সিট সিস্টেম’ বা ইইএস। এর মাধ্যমে হাতে পাসপোর্টে সিল দেওয়ার পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভ্রমণকারীদের নিবন্ধন করা হবে।
প্রথম পরিকল্পনা ছিল ২০২২ সালে চালু করা। তবে নানা কারণে তা পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের নভেম্বরে চালুর কথা থাকলেও প্রস্তুতির অভাব এবং ভ্রমণ শিল্পের উদ্বেগের কারণে তা স্থগিত হয়। অনেক দেশ আশঙ্কা করেছিল, হঠাৎ চালু করলে বিমানবন্দর ও সীমান্তে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।
কে এই সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত হবেন?
ইইএস প্রযোজ্য হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে আসা ভ্রমণকারীদের জন্য। যারা শেনজেন অঞ্চলে ১৮০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯০ দিন থাকতে পারবেন। শেনজেন অঞ্চলে ইইউ’র ২৫টি দেশসহ আইসল্যান্ড, লিচটেনস্টেইন, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড অন্তর্ভুক্ত। সাইপ্রাস ও আয়ারল্যান্ড এই তালিকার বাইরে।
প্রথমবার প্রবেশের সময় ভ্রমণকারীর আঙুলের ছাপ, মুখের ছবি এবং ভ্রমণ নথির তথ্য সংগ্রহ করা হবে। পরবর্তী তিন বছরে পুনঃপ্রবেশে শুধু সংরক্ষিত বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাই করলেই হবে।
ভ্রমণকারীদের জন্য পরিবর্তন
বিমানবন্দর বা স্থলসীমান্তে ভ্রমণকারীরা সেলফ-রেজিস্ট্রেশন কিয়স্ক ব্যবহার করতে পারেন অথবা পাসপোর্ট কন্ট্রোল কর্মকর্তার কাছে বায়োমেট্রিক তথ্য জমা দিতে হবে। ভবিষ্যতে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনের সুবিধা চালু হবে। সুইডেনে ইতিমধ্যেই এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে।
সীমান্ত কর্মকর্তারা প্রয়োজনে অতিরিক্ত নথিও চাইতে পারেন। এর মধ্যে থাকতে পারে হোটেল বা বাসস্থানের বুকিং প্রমাণ, পর্যাপ্ত অর্থের প্রমাণ, ভ্রমণ বিমা এবং ফেরত টিকিট। ১২ বছরের নিচের শিশুদের আঙুলের ছাপ দেওয়া থেকে অব্যাহতি থাকবে, তবে তাদের মুখের ছবি স্ক্যান করা হবে।
সাইপ্রাস ও আয়ারল্যান্ডে সিস্টেমটি প্রযোজ্য নয়। সেখানে আগের মতো পাসপোর্টে সিল মারা হবে। ইইউ রেসিডেন্স কার্ডধারী, গবেষণা বা শিক্ষার উদ্দেশ্যে ভ্রমণকারীরাও এর বাইরে থাকবেন।
কেন এই পরিবর্তন?
প্রধান লক্ষ্য হলো নিরাপত্তা বৃদ্ধি। পাশাপাশি অপরাধ দমন, ভিসার সময়সীমা অতিক্রমকারীদের শনাক্তকরণ, পরিচয় জালিয়াতি রোধ এবং অবৈধ অভিবাসন হ্রাস। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ইইউতে অবৈধ প্রবেশের সংখ্যা ছিল ৭৫৯০০, যা আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ কম। তবে কিছু ভূমধ্যসাগরীয় রুটে বাংলাদেশ, আলজেরিয়া, সোমালিয়ার নাগরিকদের প্রবেশ বেড়েছে।
কোথায় প্রথমে চালু হবে?
প্রথম পর্যায়ে ইইএস চালু হবে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তে, যেমন যুক্তরাজ্যের পোর্ট অব ডোভার, সেন্ট প্যানক্রাস ইন্টারন্যাশনাল ও ফোকস্টোন। এসব স্থানে ইউরোপগামী ট্রেন বা ফেরিতে ওঠার আগে সীমান্ত চেক সম্পন্ন হবে। ফলে মূল ভূখণ্ডে পৌঁছে আর আলাদা চেকের প্রয়োজন হবে না। ধাপে ধাপে সিস্টেমটি ২৫টি ইইউ দেশ ও শেঞ্জেন অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড ও লিচেনস্টাইনে কার্যকর হবে।
ভবিষ্যতে আরও পরিবর্তন
ইইএস চালুর পর ইইউ একটি অনলাইন অনুমতি ব্যবস্থা চালু করবে—ইউরোপীয় ট্রাভেল ইনফরমেশন অ্যান্ড অথোরাইজেশন সিস্টেম (ইটিআইএএস)। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ESTA-এর মতো কাজ করবে। যাত্রীদের আগে থেকে অনলাইনে অনুমতি নিতে হবে। ফি ধরা হয়েছে ২০ ইউরো এবং এটি তিন বছরের জন্য বৈধ থাকবে। ৫৯টি ভিসামুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য, যার মধ্যে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রও আছে। লক্ষ্য করা হয়েছে, এই সিস্টেম ২০২৬ সালের শেষের দিকে চালু হবে।
ভ্রমণ ও পর্যটনের প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইইএস চালু হলে সীমান্ত প্রক্রিয়াকরণ দ্রুততর হবে। এটি ভ্রমণকারীদের জন্য সুবিধাজনক হবে। গ্রীষ্মকালীন ছুটি বা উৎসবের সময় দীর্ঘ লাইনের ঝামেলা কমবে। তবে শুরুর দিকে নতুন সিস্টেমে অপরিচিত ভ্রমণকারীরা বিভ্রান্তি বা বিলম্বের মুখে পড়তে পারেন।
ইইউর নতুন এন্ট্রি-এন্ড-এক্সিট সিস্টেম আন্তর্জাতিক ভ্রমণ প্রক্রিয়ায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনছে। বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমান্ত চেক হবে দ্রুত, নিরাপদ ও কার্যকর।

