আল–জাজিরার বিশ্লেষণ—কী বলছেন ইউক্রেনীয় বিশেষজ্ঞরা—
যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠক আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিশেষ নজর কেড়েছে। কিয়েভভিত্তিক ইউক্রেনীয় বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈঠকটি ছিল এক অসাধারণ কৌশলের প্রদর্শনী, যেখানে পুতিন নিজস্ব কৌশল প্রয়োগ করে একজন আত্মপ্রেমী নেতাকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর ক্ষেত্রে বৈঠক থেকে কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।
আল–জাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে, কিয়েভভিত্তিক এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক জানিয়েছেন, ট্রাম্প ও পুতিনের বৈঠক মূলত পারস্পরিক রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির জন্য হয়েছে। বিশেষজ্ঞের মতে, পুতিন নিজের সাবেক গুপ্তচর কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে ট্রাম্পকে চতুর প্রশংসা ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রভাবিত করেছেন। বিশ্লেষক জানিয়েছেন, পুতিন পূর্ব জার্মানিতে সোভিয়েত গুপ্তচর হিসেবে কাটানো বছরগুলোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন। সেই সময় তিনি গুপ্তচরবৃত্তির জন্য লোকবল সংগ্রহ করতেন এবং কৌশলী কূটনীতি প্রয়োগ করতেন।
আলাস্কার এলমেনডর্ফ-রিচার্ডসন ঘাঁটির রানওয়েতে ট্রাম্প ও পুতিন পরস্পরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পুতিন ট্রাম্পকে ‘শুভ সকাল, প্রিয় প্রতিবেশী’ বলে অভ্যর্থনা জানান, যা ভৌগোলিকভাবে আলাস্কার অবস্থান উত্তর-পূর্ব রাশিয়ার কাছাকাছি হওয়াকে ইঙ্গিত করে। ট্রাম্প পুতিনের জন্য লালগালিচা বিছিয়ে স্বাগত জানান এবং তাকে প্রেসিডেন্টের জন্য নির্ধারিত গাড়ি ‘দ্য বিস্ট’-এ চড়ে আনেন। গাড়িতে বসে পুতিন আনন্দিত দেখাচ্ছিলেন।
সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে পুতিন বারবার ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। বৈঠক, ইউক্রেন ইস্যু এবং সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য প্রায়ই পুতিনের কথার প্রতিধ্বনি হিসেবে ধরা পড়ে। পুতিন উল্লেখ করেন, তিনি মনে করেন ২০২০ সালের নির্বাচনে যদি ট্রাম্প জিততেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ হতো না।

কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুতিন ট্রাম্পকে প্রভাবিত করতে প্রশংসা ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কৌশল ব্যবহার করেছেন। বিশেষজ্ঞের মতে, ট্রাম্প এই প্রশংসায় প্রভাবিত হয়ে বলেছিলেন, ‘চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো চুক্তি নেই’।
বৈঠকটি সাত ঘণ্টা চলার কথা থাকলেও তা তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে শেষ হয়। যৌথ মধ্যাহ্নভোজ হয়নি এবং বন্ধ দরজার আড়ালে আলোচনার বিষয়বস্তু প্রধানত ইউক্রেনের যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পুতিন একজন আত্মপ্রেমী মানুষকে প্রভাবিত করার জন্য যথাযথ কৌশল প্রয়োগ করেছেন। তিনি বারবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের আগ্রহের বিষয়গুলোর ওপর জোর দিয়েছেন, যা ট্রাম্পকে তার রাজনৈতিক স্বার্থে কার্যকর করতে সহায়তা করেছে।
বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে পুতিন আট মিনিট বক্তৃতা দেন। তিনি আলাস্কার ইতিহাস এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ও মার্কিন সেনার একজোট হয়ে কাজ করার উদাহরণ তুলে ধরেন। অন্যদিকে, ট্রাম্প মাত্র তিন মিনিট বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “বৈঠকে আমরা আরো আলোচনার ব্যাপারে সম্মত হয়েছি। অনেক বিষয়ে একমত হয়েছি। তবে কিছু বড় বিষয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি। কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তাই চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো চুক্তি হবে না।”
পুতিন আরো বলেন, “ভবিষ্যতে স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংঘাতের মূল কারণগুলো দূর করতে হবে। রাশিয়ার সব বৈধ উদ্বেগ বিবেচনা করতে হবে।” এখানে ‘মূল কারণ’ বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতা অস্বীকার করা।
অন্যদিকে, কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষক ইগার টাইশকেভিচ বলেন, বৈঠক পুতিনের জন্য পুরোপুরি সফল হয়নি। তিনি মনে করেন, রাশিয়া অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে ট্রাম্পকে তাৎক্ষণিক সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করছে এবং চীনকে নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও দর-কষাকষি করছে। তাই ইউক্রেন শুধু পার্শ্বচরিত্রের মতো ভূমিকা পালন করছে। টাইশকেভিচ আরও বলেন, হোয়াইট হাউস চায় না মস্কো ও বেইজিংয়ের স্বার্থ মিলে যাক। ট্রাম্প মস্কোর সঙ্গে ব্যবসা ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে লাভজনক মনে করছেন। যুক্তরাষ্ট্র পুতিনকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করতে আগ্রহী নয়।

ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা সম্পর্কে টাইশকেভিচ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, রাশিয়া ইউক্রেনে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরো জোরদার করতে পারে। যুদ্ধের সক্ষমতা থাকা নাগরিকদের আরো বেশি করে মোতায়েন করতে পারে। এটি ইউক্রেনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সাবেক উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইহর রোমানেনকো বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক পুতিনকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা দিয়েছে। তিনি মনে করেন, পুতিনকে বৈধতা দেওয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। রাশিয়ার কর্মকাণ্ডের জন্য পুতিনকে জবাবদিহি করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা পূরণ করেননি এবং ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে কোনো স্থির অবস্থান নেননি।
রোমানেনকো আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই বৈঠকের পর রাশিয়া ইউক্রেনের পূর্ব সীমান্তে হামলা জোরদার করবে এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ধ্বংসাত্মক বিমান হামলা চালাবে। তিনি মনে করেন, ইউক্রেনকে এখন কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এমন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যুদ্ধের জন্য সক্ষম নাগরিকদের প্রস্তুত করা এবং অর্থনীতির সামরিক চাহিদা অনুযায়ী পরিচালনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বোপরি, ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক জটিল দিক উন্মোচন করেছে। পুতিন কৌশলগতভাবে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করেছেন, তবে ইউক্রেন যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান বা যুদ্ধবিরতি স্থাপনের ক্ষেত্রে বৈঠক কার্যকর হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে ইউক্রেনকে আরো জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে রাশিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক চাপে তাদের কৌশলগত প্রস্তুতি অপরিহার্য।

