বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একটি ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন শুধুমাত্র একটি স্লোগান নয়, এটি এখন প্রতিটি রাষ্ট্রের আইনগত দায়িত্ব। প্রতিটি দেশকে তাদের নাগরিকদের জলবায়ু বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা বাধ্যতামূলক।
এই মামলা শুরু হয়েছিল প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুর উদ্যোগে। ভানুয়াতু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব দেয়, যা ১৩২টি দেশের সমর্থন পায়। এরপর আইসিজে এই মামলার বিস্তারিত শুনানি করে।
মামলার মূল প্রশ্ন ছিল দুটি। প্রথম, রাষ্ট্রগুলোর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কী ধরনের আইনি দায়িত্ব রয়েছে? দ্বিতীয়, যদি তারা এই দায়িত্ব পালন না করে, তবে তার পরিণতি কী হবে?
আইসিজের রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রগুলো বাধ্য নাগরিকদের জলবায়ু ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে। এই দায়িত্ব কেবল প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী নয় বরং পরিবেশ আইন, মানবাধিকার আইন এবং আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইন অনুসারে রাষ্ট্রগুলোর বাধ্যবাধকতা হিসেবে বিবেচিত।
আইসিজের সভাপতি ইউজি ইওয়াসাওয়া বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন এখন পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।” একই সঙ্গে, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের জাতিসংঘ প্রতিনিধি জন সিল্ক বলেন, “বিজ্ঞান যেমন স্পষ্ট, এখন আইনও তেমনি স্পষ্ট।”
রায়টি সব বিচারকের একমতের ভিত্তিতেই হয়েছে। তবে এর পেছনের গল্প আরও অনন্য। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জলবায়ু মামলা কোনো সরকারি অফিস বা বড় প্রতিষ্ঠানে শুরু হয়নি, হয়েছিলো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে।
২০১৯ সালে, প্রশান্ত মহাসাগরের ২৭ জন আইনশিক্ষার্থী মিলে “প্যাসিফিক আইল্যান্ডস স্টুডেন্টস ফাইটিং ক্লাইমেট চেঞ্জ (PISFCC)” নামে একটি সংগঠন তৈরি করে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন সলোমন আইল্যান্ডসের সলোমন ইয়েও, সিনথিয়া হৌনিউহি, ফিজির বিশাল প্রসাদ, টোঙ্গার সিওসিউয়া ভেইকুনে এবং আরও কয়েকজন।
তাদের কাছে বড় কোনো অর্থ বা অভিজ্ঞ কূটনীতির সহায়তা ছিল না। কিন্তু তাদের ছিল ইচ্ছাশক্তি এবং সাহসিকতা, যা এই আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক জাস্টিন রোজ বলেন, “আপনি জিতুন বা হারুন, কিছু লড়াই আছে যেগুলো লড়াই করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল তার শ্রেণিকক্ষের একটি অনুশীলন থেকেই।
এই রায় কেবল আইনের দিক থেকে নয় বরং জলবায়ু ন্যায়বিচার আন্দোলনের জন্যও বড় বিজয়। সুইডিশ কর্মী গ্রেটা থানবার্গ যখন একক প্রতিবাদ শুরু করেছিলেন, তখন থেকেই এই আন্দোলন বিশ্বজুড়ে সমর্থন পাচ্ছিল। এবার প্রথমবারের মতো আন্দোলনের আন্তঃপ্রজন্মীয় দাবি—সম্মান এবং আইনগত স্বীকৃতি—আইন ও আদালতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেল।
এই রায়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, রাষ্ট্রগুলো আর জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দেরি করতে পারবে না। নাগরিকদের প্রাণ, সম্পদ এবং পরিবেশ সুরক্ষা দিতে হবে। এটি শুধু রাজনৈতিক বা সামাজিক দায়বদ্ধতা নয় বরং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক কর্তব্য।
আইসিজের এই রায় ভবিষ্যতে জলবায়ু সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতি, কৌশল এবং আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে এটি তরুণদের আন্দোলন এবং সামাজিক সচেতনতাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে, যা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী নির্দেশমূলক রায় তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) সাম্প্রতিক রায় জলবায়ু ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে বড় এক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এটি শুধুমাত্র আইনের বিজয় নয় বরং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্যও বড় এক সাফল্য। বহু বছর ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলো দাবি করে আসছিল, তারা এমন এক পরিবেশগত সমস্যার শিকার, যার জন্য তারা দায়ী নয়। এই রায়ে আন্তর্জাতিক আদালত সেই বৈষম্য স্বীকার করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো যেমন ভানুয়াতু, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, কিরিবাতি—যাদের উপকূল সমুদ্রের জলে ডুবে যাচ্ছে, মিষ্টিপানি লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে—তাদের পরিস্থিতি এই রায়ে গুরুত্বসহকারে দেখা গেছে। এতদিন তারা ছিল নিঃশব্দ ভুক্তভোগী, এখন তারা আন্তর্জাতিক আইনের মূল চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এটি আইসিজের প্রথম প্রচেষ্টা নয়। ২০১২ সালে পলাউ ও মার্শাল দ্বীপপুঞ্জও একইভাবে আন্তর্জাতিক আদালতের সহায়তা চেয়েছিল। তবে তখন রাজনৈতিক সমর্থনের অভাবের কারণে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। এবার সাফল্যের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে প্রশান্ত মহাসাগরের তরুণরা। তারা প্রচলিত কূটনীতি অনুসরণ না করে, নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সামনে নিয়ে নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সিনথিয়া হৌনিউহি’র নাম—যিনি ভানুয়াতুর তরুণ প্রতিনিধির একজন। তিনি জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার সময় সবসময় শামুকখচিত ঐতিহ্যবাহী মুকুট পরতেন। তারা আদালতের শুনানিকে শুধু আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেননি বরং গান, নাচ ও উচ্ছ্বাসের মাধ্যমে উৎসবের মতো উদযাপন করেছেন। এমন পরিবেশ তৈরি করার ফলে আইসিজের প্রক্রিয়ায় আন্দোলনের গন্ধও তৈরি হয়।
এই তরুণরা একা নয়। তারা ভানুয়াতুর পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ক্যারিবীয় মিত্র দেশ এবং বিশ্বজুড়ে তরুণ কর্মীদের সঙ্গে জোট গড়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন পেয়েছে। কেউ কেউ ক্ষতিপূরণ দাবিও তোলেন। ফলে আইসিজের শুনানি কেবল বিচারিক প্রক্রিয়া নয়, একধরনের আন্তর্জাতিক আন্দোলনে পরিণত হয়।
এদিকে, অন্যান্য আন্তর্জাতিক আদালতও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। সমুদ্র আইন বিষয়ক ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রগুলোকে গ্রিনহাউস গ্যাস থেকে সৃষ্ট দূষণ কমাতে নির্দেশ দিয়েছে। আমেরিকার মানবাধিকার আদালত জলবায়ু পরিবর্তনকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আফ্রিকান কোর্টও একই বিষয়ে রায় দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আইসিজের রায় অবশ্য বাধ্যতামূলক নয়। তবে এর প্রভাব অনেক। এটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে। আইনজীবী, কর্মী এবং আইন প্রণেতাদের কাছে এটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। এমনকি এটি দেশগুলোর ভেতরের মামলা ও আন্তর্জাতিক মামলা উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ইতালির তেল কোম্পানি ‘এনি’-এর বিরুদ্ধে গ্রিনপিসের মামলা উল্লেখ করা যায়। ভবিষ্যতে দেশগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে জলবায়ু সম্পর্কিত মামলা করতে পারবে।
এখন জলবায়ু আইন কেবল প্রতিশ্রুতি বা আলোচনা নয়। ধীরে ধীরে এটি বৈশ্বিক আইনের অংশে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো একক বিশ্ব সরকার নেই, তবে সমস্ত দেশে স্বীকৃত সাধারণ নিয়ম তৈরি হচ্ছে।
এই লড়াইয়ে শিক্ষার্থীরা অসংখ্য বাধার মুখোমুখি হয়েছিল। টাকার অভাব, ভিসার জটিলতা, দূরত্ব—সব বাধা তাদের থামাতে পারেনি। তারা প্রমাণ করেছেন, বড় পরিবর্তন শুধুমাত্র ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদ বা অভিজ্ঞ আইনজীবীর হাতেই আসে না। প্রান্তিক মানুষও তা করতে পারে।
রায় ঘোষণার পর হৌনিউহি বলেন- “আমরা ছিলাম, আর আমাদের কথা শোনা হয়েছে।” তিনি শুধু নিজের হয়ে নয়, পুরো প্রশান্ত মহাসাগরীয় জনগণ ও বিশ্বজুড়ে তরুণদের পক্ষ থেকে এই বার্তা দিয়েছেন। আইসিজ তাদের কণ্ঠ শুনেছে। ধীরগতির হলেও আন্তর্জাতিক আইন এখনও পরিবর্তনের শক্তি রাখে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক জাস্টিন রোজ মন্তব্য করেছেন- “আন্তর্জাতিক আইন নিজেই গল্পের ভান্ডার।”
আইসিজের এই রায় আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, ভালো সমাপ্তি এখনো সম্ভব। জলবায়ু ন্যায়বিচারের লড়াইতে ছোট রাষ্ট্র, তরুণ আন্দোলন ও সাধারণ মানুষও বিশ্ব আইনের মাধ্যমে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এটি কেবল একটি আইনি রায় নয়; এটি বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের জন্য নতুন আশা, নতুন শক্তি এবং নতুন কৌশলের দিকনির্দেশ।

