যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারো আলোচনার কেন্দ্রে। সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার সময় তিনি নিজেকে তথাকথিত ‘শান্তির প্রবক্তা’ হিসেবে তুলে ধরে দুটি বড় দাবি করেন। প্রথমত, তিনি যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে স্থায়ী শান্তিচুক্তি চান। দ্বিতীয়ত, তার প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তিনি ছয়টি বড় যুদ্ধ বন্ধ করেছেন।
এই ছয়টি যুদ্ধের তালিকায় ট্রাম্প উল্লেখ করেন— ইসরায়েল-ইরান, ডিআর কঙ্গো-রুয়ান্ডা, কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড, ভারত-পাকিস্তান, সার্বিয়া-কোসোভো এবং মিশর-ইথিওপিয়া। তিনি দাবি করেন, তার প্রশাসনের মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধগুলো শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো যুদ্ধাবস্থা থেকে সরে এসেছে।
কিন্তু গার্ডিয়ানসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ ও বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য শুধু অতিরঞ্জিত নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মিথ্যা। বাস্তবে অনেক সংঘাত এখনো অব্যাহত, আবার কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সরাসরি অস্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। ফলে প্রশ্ন উঠেছে— ট্রাম্প কি শান্তির প্রতীক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে তথ্য বিকৃত করছেন? নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ?
কঙ্গো-রুয়ান্ডা সংঘাত: যুদ্ধ শেষ হয়নি-
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তাদের প্রচেষ্টায় ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো এবং রুয়ান্ডার মধ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটেছে। বাস্তবে তা ঘটেনি। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে রুয়ান্ডা-সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এখনো সশস্ত্র কার্যক্রম চালাচ্ছে। দোহায় আলোচনার সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও কোনো স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কঙ্গোর ইটুরি ও নর্থ কিভু অঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাত বেড়েছে। বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এবং বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় ট্রাম্পের ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার’ দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইসরায়েল-ইরান: যুদ্ধবিরতি নয়, সামরিক হামলা-
ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ থামিয়েছেন। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এটি সত্যের সঙ্গে মেলে না। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। পরে ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য করা হয়। এটি কোনো আলোচনার মাধ্যমে শান্তিচুক্তি নয়, বরং চাপ প্রয়োগ করে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার উদাহরণ।
তাছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এমন জটিল যে শুধুমাত্র মার্কিন প্রশাসনের ভূমিকা দিয়ে সংঘাতকে ব্যাখ্যা করা যায় না। ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা আজও অব্যাহত এবং কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি হয়নি।
ভারত-পাকিস্তান: ট্রাম্পের ভূমিকা অস্বীকার-
কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত ও পাকিস্তানের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী। ট্রাম্প বলেন, মে মাসে তার মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ভারত এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কাশ্মীর ইস্যুতে কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা তারা কখনোই মেনে নেয়নি।
এমনকি পাকিস্তানও প্রকাশ্যে ট্রাম্পের দাবি সমর্থন করেনি। বাস্তবে যুদ্ধবিরতি হলেও তা দুই দেশের সামরিক পর্যায়ের সমঝোতার ফল ছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপ নয়।
মিশর-ইথিওপিয়া: বাঁধ বিরোধের কোনো সমাধান হয়নি-
নীল নদের ওপর ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড রেনেসাঁস ড্যাম (GERD) প্রকল্প নিয়ে বহু বছর ধরে মিশর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে উত্তেজনা রয়েছে। মিশর আশঙ্কা করছে, বাঁধ পূর্ণ হলে তাদের পানির প্রবাহ হ্রাস পাবে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, এই সংঘাতও তিনি থামিয়েছেন।
কিন্তু বাস্তবে কোনো সমাধান হয়নি। এখনো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা হচ্ছে এবং বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘ ও আফ্রিকান ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় বৈঠক হয়েছে। কিন্তু স্থায়ী চুক্তি হয়নি। বরং ইথিওপিয়া তাদের বাঁধের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, আর মিশর কূটনৈতিক চাপ বজায় রেখেছে।
সার্বিয়া-কোসোভো: যুদ্ধের কোনো পরিকল্পনা ছিল না-
সার্বিয়া ও কোসোভোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের কোনো আশঙ্কা ছিল না। বরং তাদের বিরোধ ছিল সীমান্ত উত্তেজনা ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি নিয়ে। সার্বিয়া বলেছে, তারা কোনো যুদ্ধ পরিকল্পনা করেনি। কিন্তু ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি যুদ্ধ প্রতিরোধ করেছেন। বাস্তবে যেটি ঘটেনি সেটি প্রতিরোধ করার কৃতিত্ব নেওয়া রাজনৈতিক কৌশল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড: সীমান্ত উত্তেজনা, যুদ্ধ নয়-
ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের মধ্যে সংঘাত তার হস্তক্ষেপে বন্ধ হয়েছে। সত্যি বলতে, সীমান্তে গোলাগুলি হয়েছিল এবং স্বল্পমেয়াদে সহিংসতা ছড়িয়েছিল। কিন্তু এটিকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বলা যায় না। সীমান্তে এই ধরনের সংঘর্ষ ইতিহাসে বহুবার ঘটেছে এবং সাধারণত স্থানীয় চুক্তির মাধ্যমে তা শান্ত হয়।
ট্রাম্প ফোন করে উভয় দেশের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, সেটি সত্য। কিন্তু এটি বড় ধরনের যুদ্ধ বন্ধ করার কৃতিত্ব নয়, বরং সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা মাত্র।
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান পরিবর্তন-
ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, তিনি যুদ্ধবিরতি চান না, বরং একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি চান। আলাস্কায় ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি জানান, ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন নেই।
পুতিন দাবি করেছেন, যুদ্ধবিরতির আগে ইউক্রেনকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে হবে। অন্যদিকে কিয়েভের অবস্থান হলো— ভূখণ্ডগত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যুদ্ধবিরতি জরুরি। এই মতপার্থক্যের মাঝেই ট্রাম্প নিজেকে নিরপেক্ষ শান্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছেন।
কিন্তু তার অতীত রেকর্ডই দেখায়, তিনি বিভিন্ন সংঘাতে একদিকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন, আবার অন্যদিকে তা অস্বীকার করেছেন। যেমন— ভারত-পাকিস্তান ও কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ডের ক্ষেত্রে তিনি নিজেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করেছিলেন। এখন আবার বলছেন তিনি কখনো যুদ্ধবিরতি চাননি।
বিশ্লেষণ: রাজনৈতিক প্রচারণা নাকি শান্তি প্রচেষ্টা?
ট্রাম্পের বক্তব্যকে বিশ্লেষকরা রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবে দেখছেন। তিনি নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তিনি দেখাতে চাইছেন, তিনি এমন একজন নেতা যিনি যুদ্ধ শেষ করতে পারেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো— তার উল্লেখিত ছয়টি সংঘাতের মধ্যে কোনো ক্ষেত্রেই স্থায়ী শান্তি আসেনি। কোথাও যুদ্ধবিরতি হয়েছে, কোথাও সীমান্ত উত্তেজনা কমেছে, আবার কোথাও সংঘাত চলছেই। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অস্বীকার করেছে।
পরিশেষে, ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তিনি ছয়টি যুদ্ধ থামিয়েছেন। কিন্তু বাস্তব প্রমাণ ভিন্ন কথা বলে। কঙ্গো-রুয়ান্ডা, ইসরায়েল-ইরান, মিশর-ইথিওপিয়া কিংবা ভারত-পাকিস্তানের সংঘাতে এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে। সার্বিয়া-কোসোভো ও কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ডের ক্ষেত্রেও যুদ্ধের কোনো বড় হুমকি ছিল না। ফলে তার বক্তব্য অতিরঞ্জিত, অনেকাংশে বিভ্রান্তিকর।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্প হয়তো দ্রুত রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সুবিধা নিতে চাইছেন। তিনি নিজেকে যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে শান্তিচুক্তির প্রবক্তা হিসেবে দেখাতে চাইলেও বাস্তবে তার অর্জন অনেকটাই সীমিত। ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি এই দাবিগুলোকে আরো প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই ট্রাম্পের ছয়টি যুদ্ধ থামানোর দাবি এ বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে টিকে না।

