সমুদ্র সংরক্ষণ এখন কেবল পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়। এটি শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে এবং দেশের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও মজবুত করছে। বিশেষ করে বৃত্তাকার অর্থনীতি বা সার্কুলার ইকোনমি প্রযুক্তির নতুন উদ্ভাবন সমুদ্র সংরক্ষণের কাজকে শিল্প ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। তবে এর পুরো সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে, যারা ব্লু ইকোনমিতে কাজ করছেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। তারা যদি সমুদ্র সংরক্ষণকে শুধু পরিবেশগত দায়বোধ হিসেবে দেখার বদলে শিল্প, বিনিয়োগ ও স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেন, তাহলে এ ক্ষেত্রের সম্ভাবনা অনেক বেশি প্রসারিত হবে।
১৯৬০ সালে জ্যাক পিকার্ড, মেরিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে পৌঁছান। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর সমুদ্রগহ্বর, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১ হাজার মিটার নিচে। এই অভিযান কেবল শিরোনাম বা সুনাম তৈরি করার জন্য ছিল না। মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি ভুল ধারণাকে প্রমাণ করা। অনেক বিশেষজ্ঞ তখন বলছিলেন, সমুদ্রের গভীর অন্ধকারে কোনো জীবন বাঁচতে পারে না। এই ধারণার কারণে তখন প্রস্তাব করা হয়েছিল গভীর সমুদ্রে পারমাণবিক বর্জ্য ফেলা।
কিন্তু তিনি ও তার দল সেখানে জীবন্ত মাছ দেখতে পান। এই আবিষ্কারটি প্রমাণ করে, সমুদ্রের গভীরতাতেও জীবন আছে। ফলে সম্ভাব্য ভয়ানক একটি ভুলের হাত থেকে বিশ্বকে রক্ষা করা সম্ভব হলো।
এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে সমুদ্রের গভীর জীবন ও তার সংরক্ষণকে বোঝা কতটা জরুরি। প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা শুধু পরিবেশ রক্ষা করতে পারি না বরং নতুন শিল্প, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করতে পারি। সমুদ্র সংরক্ষণ এবং ব্লু ইকোনমির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের শিল্প ও সমাজ উভয়ই লাভবান হতে পারে।
জ্যাক পিকার্ড এর অনুসন্ধানটি আমাদের প্রকৃত মানে বোঝায়। এটি কখনো জয় বা দখলের জন্য নয়। বরং এটি কৌতূহল, জানার ইচ্ছা এবং বোঝাপড়ার প্রতিফলন। প্রকৃতিকে অধ্যয়ন কেবল আমাদের জ্ঞান বাড়ায় না, এটি আমাদের দায়িত্বকেও বাড়ায়। আমরা পৃথিবীর রক্ষক হিসেবে কিভাবে দায়িত্ব নিতে পারি, তা বোঝার সুযোগ দেয়।
আজ সমুদ্র আগের চেয়ে অনেক বেশি হুমকির মুখে। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক জলরাশিতে প্রাইভেট কোম্পানিগুলিকে গভীর সমুদ্র খনিতে অংশ নিতে অনুমতি দিয়েছে। এটি সমুদ্র সংরক্ষণে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। দীর্ঘ সময় ধরে আমরা সমুদ্রকে অপরিসীম সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করছি এবং অনেক জায়গায় এটি আবর্জনার গহ্বর হিসেবে পরিণত হয়েছে। আমরা প্লাস্টিক দিয়ে সমুদ্রকে দূষিত করছি, কার্বন নির্গমনের মাধ্যমে পানি উত্তপ্ত করছি, রাসায়নিক দিয়ে সমুদ্রকে বিষাক্ত করছি এবং অতিমাত্রায় মাছ ধরার মাধ্যমে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছি।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমাদের কাজ ও জ্ঞানের মধ্যে ফাঁক। আমরা অনেক কিছু জানি কিন্তু তা অনুসারে পদক্ষেপ নিচ্ছি না। ১৯৬০ সালের মতো, এখনো আমাদের জানা এবং করার মধ্যে বড় ফারাক রয়ে গেছে।
সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বহুবার সমুদ্র সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে চুক্তি এবং লক্ষ্য স্থির করেছে। কিন্তু বাস্তবে পদক্ষেপগুলো বিচ্ছিন্ন এবং অসম্পূর্ণ। সমুদ্রের অবনতির গতি যত বাড়ছে, সরকারগুলো প্রায়ই জটিল বৈশ্বিক সমঝোতার আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রাখে। এর কারণে অবৈধ মাছ ধরা, বিশেষ করে সুরক্ষিত এলাকায় বটম ট্রলিং, এখনও বন্দর ও বাজারে বিক্রি হচ্ছে। যদিও নিয়মকানুন আছে, বাস্তবায়ন দুর্বল, বিচ্ছিন্ন বা প্রায় নেই বললেই চলে।
আমাদের দায়িত্ব হলো সমুদ্রকে রক্ষা করা। শুধু কথা বলা নয়, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি। সমুদ্রকে বাঁচানো মানে আমাদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা।
আমরা নিখুঁত চুক্তি বা পরিকল্পনার অপেক্ষা করতে পারি না। অন্যদের ব্যর্থতা আমাদের কাজ না করার কারণ হতে পারে না। সমস্যার সমাধান আমরা ইতিমধ্যেই জানি, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও আমাদের হাতে আছে। শুধু অভাব আছে ইচ্ছাশক্তির।
সোলার ইম্পালস ফাউন্ডেশন এ বিষয়ে কাজ করছে। তারা ১৮০০-এর বেশি পরিবেশবান্ধব এবং লাভজনক পদ্ধতি ও প্রযুক্তি চিহ্নিত করেছে। এসব প্রযুক্তি অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে একসাথে মেলাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ব্লু ইকোনমি বা জলসম্পদভিত্তিক অর্থনীতিতে এদের গুরুত্ব বেশি।
ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক প্রযুক্তি ও উদ্যোগ পুনর্জীবনশীল এবং টেকসই প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মহাকাশ থেকে জাহাজের চলাচল নজরদারি এবং অবৈধ মৎস্য আহরণ সনাক্ত করা, কম কার্বন নিঃসরণযুক্ত জাহাজ চালনা, প্লাস্টিক বর্জ্য কমানো এবং পুনর্জীবনশীল এক্যুয়াকালচার বা চাষ প্রক্রিয়া উন্নত করা। এই সব প্রযুক্তি ও পদ্ধতি শুধু পরিবেশ রক্ষা করে না বরং ব্যবসার জন্যও লাভজনক।
ফাউন্ডেশনটি মনে করে, যথাযথ পরিকল্পনা ও ইচ্ছাশক্তি থাকলেই আমরা এই সব সমাধান বাস্তবায়ন করতে পারি। অর্থাৎ, সমস্যা বোঝা আছে, সমাধান আছে, সরঞ্জাম আছে, শুধু প্রয়োজন উদ্যোগ নেওয়ার সাহস।
সাম্প্রতিক ‘ওশান অপরচুনিটি গাইড’-এ সমুদ্রভিত্তিক উদ্ভাবনের বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রতিবেদন দেখাচ্ছে, সমুদ্র রক্ষা ও টেকসই ব্যবহারের জন্য নানা ধরনের সমাধান বাস্তবধর্মী ও কার্যকর। উদাহরণ হিসেবে আছে এমন কংক্রিট যা সমুদ্রজীবনের জন্য উপকারী, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বদলে সীউইড ব্যবহার করা এবং এমন প্রযুক্তি যা সীফুড শিল্পে সবুজ-প্রচার (greenwashing) রোধ করে। এসব শুধু ধারণা নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যেই ব্যবহার হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলীদের বড় একটি সম্প্রদায়, যারা সমুদ্র সংরক্ষণ ও উদ্ভাবনের কাজে যুক্ত।
এছাড়া নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও তৈরি হচ্ছে, যা উদ্ভাবন থেকে বড় পরিসরে বাস্তবায়নের ফাঁক পূরণ করছে। ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স, ফলাফলের ভিত্তিতে অর্থ প্রদান এবং ঝুঁকি হ্রাসকারী উপকরণগুলো প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান এবং টেকসই অ্যাকোয়াকালচারের জন্য মূলধন খুলে দিচ্ছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অর্থনীতিতে, যেখানে ঝুঁকি বেশি, সেখানে এসব নতুন অর্থনৈতিক যন্ত্রাংশ বিনিয়োগকে আরও স্থিতিশীল করছে। এ থেকে বোঝা যায়, যখন বিভিন্ন অংশীদার একসাথে কাজ করে, তখন জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য একটি শক্তিশালী উদ্ভাবন পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা সমাধানগুলো পরীক্ষিত, বড় পরিসরে ব্যবহারযোগ্য এবং অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর। এগুলো কেবল পরিবেশ রক্ষা করে না, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করে, নতুন বাজার গড়ে তোলে এবং দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি কমায়। সমুদ্র অর্থনীতিতে পরিষ্কার ও টেকসই উদ্ভাবন ইতিমধ্যেই কোম্পানি ও দেশের জন্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করছে। প্রকৃতি-ভিত্তিক বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো আর্থিক উপকরণ উপকূলীয় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করছে এবং নতুন ধরনের মূলধনের প্রবেশ পথ তৈরি করছে।
এছাড়া, সার্কুলার ইকোনমির উদাহরণ যেমন সীউইড-ভিত্তিক প্যাকেজিং এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, পরিবেশের ওপর ক্ষতি কমাচ্ছে, খরচ হ্রাস করছে এবং সরবরাহ চেইনের স্বচ্ছতা বাড়াচ্ছে। ফলে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, ব্যবসা এবং অর্থনীতির জন্যও দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা তৈরি হচ্ছে।
সমুদ্র সংরক্ষণ এখন কেবল পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়। এটি শিল্প পুনর্গঠন এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন শক্তির উৎসে পরিণত হচ্ছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে, সমুদ্র সংরক্ষণ একটি শক্তিশালী এবং ভবিষ্যত-উপযোগী কৌশল। এটি শুধু পরিবেশের জন্য ভালো নয়, বরং বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা এবং নীতিনির্ধারকদের জন্যও সমানভাবে লাভজনক।
কিন্তু এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে আমাদের ভাবধারাই বদলাতে হবে। টেকসইতা মানে কোনো ধরনের ত্যাগ নয়। বরং এটি আধুনিক প্রযুক্তি, নতুন উদ্ভাবন এবং বেশি কার্যকরী ব্যবস্থা তৈরির সুযোগ দেয়। আমরা যদি সঠিকভাবে এগোই, তাহলে সমুদ্র সংরক্ষণ কেবল পরিবেশ রক্ষা নয় বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শিল্প সম্প্রসারণের নতুন পথ খুলবে।
সমুদ্র সংরক্ষণকে কোনো বাধা বা সীমাবদ্ধতা হিসেবে না দেখে, এটি একটি শক্তিশালী প্রণোদনা হিসেবে দেখা উচিত। এটি আমাদের আরও গতিশীল, স্থিতিশীল এবং প্রতিকূলতা সহনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতি গঠনে সাহায্য করতে পারে। নতুন দিগন্তের অনুসন্ধান আর বড় কোনো গভীরতার খোঁজ নয়; আমাদের লক্ষ্য হতে হবে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আরও উন্নত ও কার্যকর করা।
‘ওশান অপারচিউনিটি গাইড’-এর উদ্যোক্তাদের মতো আমাদেরও ভাবতে হবে। আমরা যা তৈরি করেছি, তা কি আরও ভালো করা যায়? এই অনুসন্ধানী মনোভাব আমাদের শোষণ নয় বরং পুনর্জীবনের পথে পরিচালিত করবে। এটি আমাদের উদ্বুদ্ধ করবে অপেক্ষা না করে নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে, যা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি।

