বর্তমান উন্নয়ন অর্থায়ন এবং ঋণ পুনর্গঠন ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন। বিশ্বের অনেক দেশ এখন ঋণের চাপে রয়েছে। অন্যদিকে বিদেশি সাহায্য কমছে। একই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রকৃতির ক্ষয় আরো দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক দুর্বলতা বাড়ছে। যদি তা নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তাহলে শুধু ওই দেশগুলোর জন্য নয়, পুরো বিশ্বের স্থিতিশীলতার জন্যও ঝুঁকি তৈরি হবে।
নিউ ইয়র্ক থেকে জানানো হয়েছে, জুনে চতুর্থ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন সম্মেলনের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। সরকার, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো বুঝতে পেরেছে যে বর্তমান ঋণ ও উন্নয়ন সংকট মোকাবিলার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। তারা এই সংকট সমাধানের উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত। এ পদক্ষেপগুলো আগামী সেপ্টেম্বরের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (UNGA) আগে কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন- এটি শুধুমাত্র ঋণ পুনর্গঠন নয় বরং উন্নয়ন অর্থায়নের নতুন ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়নেরও সুযোগ দিতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলো যাতে তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত নিরাপদ করতে পারে, সেজন্য এখনই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সাম্প্রতিক গবেষণা ও রিপোর্টগুলো যেমন Healthy Debt on a Healthy Planet, Jubilee Report এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষজ্ঞ দলের ঋণ বিষয়ক রিপোর্ট দেখাচ্ছে যে- বিশ্বব্যাপী ঋণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রকৃতির ক্ষয় একে অপরের সঙ্গে জড়িত। এই সমস্যাগুলো খুবই তীব্র এবং এর প্রভাব মানুষের জীবন ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক।
২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলো বাহ্যিক ঋণে নতুন অর্থ পেয়েছিল তার চেয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলার বেশি সুদ ও অর্থ পরিশোধ করেছে। এর মানে হলো পৃথিবীর প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন মানুষ– যা মোট জনসংখ্যার ৪০%-এর বেশি, এমন দেশে বসবাস করছে যেখানে সুদ পরিশোধের জন্য খরচ স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষার চেয়ে বেশি।
এই পরিস্থিতি দিনে দিনে আরো খারাপ হচ্ছে। সাহায্য অর্থ কমছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রকৃতির ক্ষয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ধীর হচ্ছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা, পরিবেশ এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপর হুমকিও বেড়েই চলেছে।
বিশ্বের অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ সমস্যার তীব্রতা ও জরুরি অবস্থা স্বীকার করেছেন। তারা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে পৌঁছানোর মূল কারণ হলো বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা মানুষের চাহিদা ও পরিবেশের প্রয়োজন মেটাতে তৈরি না হওয়া। ইতিহাসিক বৈষম্য এবং কম দরপত্র ক্ষমতার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবসময় উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এছাড়া তাদের ওপর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার প্রভাবও অসমভাবে পড়ে।
স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কৌশলগত বিনিয়োগ পরিকল্পনা না থাকায় ঋণ নীতি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেশগুলো এমন কোনো বিনিয়োগ করতে পারছে না যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বৃদ্ধি আনতে পারে। মূলধনের প্রবাহও অস্থির। অর্থনীতির ভালো সময়ে বিদেশি মূলধন প্রবাহিত হয়, কিন্তু সংকট বা ধাক্কা লাগলে তা দ্রুত চলে যায়। ঋণ পুনর্গঠন সংক্রান্ত আইন ও নীতিও সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে বিলম্বকে উৎসাহিত করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ধনী দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সহায়তার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে সক্ষম হয় কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলো এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি, কারণ কোনো বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) কিছু সাহায্য দিয়েছে Special Drawing Rights এর মাধ্যমে কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না।
এই সব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রয়োজন বৈশ্বিকভাবে স্বচ্ছ ও সমন্বিত নীতি। যা ঋণ পুনর্গঠন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও টেকসই অর্থনৈতিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। নইলে উন্নয়নশীল দেশগুলো আরও বড় ঋণ ও পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রা ও প্রকৃতির ওপর।
বিশ্বের অনেক দেশ এখন ঋণের চাপের মুখে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলার জন্য সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগ, যেমন G20 কমন ফ্রেমওয়ার্ক, খুব বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। ঋণ পুনর্গঠন ধীরে হচ্ছে এবং প্রায়ই তা অস্বচ্ছ। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া মূলত নির্ভর করছে দেশ এবং তাদের ঋণদাতাদের মধ্যে শক্তির পার্থক্যের ওপর।
আজকের দিনে ঋণ পুনর্গঠন আরও জটিল হয়ে গেছে। কারণ এতে আরও অনেক খেলোয়াড়ের সমন্বয় প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে প্যারিস ক্লাবের সার্বভৌম ঋণদাতা, নতুন দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতা যেমন চীন এবং বিভিন্ন বেসরকারি ঋণদাতা। এই পরিস্থিতিতে অনেক সময় সহায়তা আসে দেরিতে এবং প্রয়োজনীয় প্রভাবও যথেষ্ট দেয় না।
ঋণ সংকটের কারণ এত জটিল যে কোনো একক সমাধান নেই। তবে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান অবশ্যই আছে। মূল সমস্যাগুলো দূর করতে হলে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ঋণ স্থিতিশীলতা বিশ্লেষণের পদ্ধতি দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। বর্তমান পদ্ধতি সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়, জলবায়ু ও পরিবেশ সংক্রান্ত ঝুঁকি পুরোপুরি বিবেচনা করে না এবং তহবিল কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তাও পর্যাপ্তভাবে দেখা হয় না।
যদিও এই সমস্যা প্রযুক্তিগত মনে হতে পারে, এর প্রভাব মানবজীবনের উপর বিশাল। ত্রুটিপূর্ণ কাঠামোর কারণে অনেক দেশ প্রয়োজনীয় ঋণ গ্রহণে পিছিয়ে পড়েছে। এর ফলে মানুষকে শিক্ষিত করা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে মোকাবিলা করার মতো কার্যক্রমে বাধা এসেছে। ফলে দেশে উন্নয়ন ও সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে গেছে।
ঋণপ্রদাতারা বহু বছর ধরে এক সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। তারা একত্রিতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, যার ফলে ঋণগ্রহীতাদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সহজ হয় না। এখন সময় এসেছে ঋণগ্রহীতারাও একইভাবে শক্তিশালীভাবে একত্রিত হওয়ার। এজন্য নতুন কাঠামো ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজন। এর প্রথম ধাপ হতে পারে একটি ‘ঋণগ্রহীতা ক্লাব’।
এই ক্লাব ঋণগ্রহীতাদের জন্য অনেক সুবিধা আনতে পারে। এটি তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ দেবে। একত্রিত হলে তাদের সমবায় শক্তি বাড়বে এবং ঋণ পুনর্গঠন বা নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনা করার সময় তাদের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি এই ক্লাব দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং উন্নত ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে।
আগে ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা হয়েছিল কিন্তু সেগুলো প্রায়ই অস্থির এবং লক্ষ্যহীন ছিল। এখন নতুন উদ্দীপনা দেখা গেছে। তাই এখন দরকার যৌথ কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ, কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি এবং পর্যাপ্ত তহবিল নিশ্চিত করা।
ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতাদের প্রণোদনার মধ্যে পরিবর্তন আনা জরুরি। এর একটি বিকল্প হলো ‘কমন ফ্রেমওয়ার্ক’-এ এমন নিয়ম রাখা, যা ঋণগ্রহীতাদের কাছে যে ঋণভার অসম্ভাব্যভাবে বেশি হয়েছে, সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণপরিশোধ স্থগিত করবে। এছাড়া IMF-এর ‘লোনিং ইনটু অ্যারিয়ার্স’ নীতি ব্যবহার করে নিশ্চিত করা যেতে পারে যে বহুপাক্ষিক অর্থায়ন প্রকৃত প্রয়োজনের জন্য ব্যবহার হচ্ছে। অর্থাৎ, তা যেন কেবল সমস্যাযুক্ত বন্ডের পুনর্গঠনের জন্য ব্যবহার না হয়।
অর্থনৈতিক ও ন্যায়িক দিক দিয়ে বিবেচনা করলে এটি গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, কোনো বিধ্বংসী হারিকেনের পর খুবই সীমিত তহবিল থাকা অবস্থায় সেই অর্থ দূরের ঋণদাতাদের কাছে চলে গেলে প্রকৃত প্রয়োজনমত খাদ্য ও আশ্রয়ের জন্য বিতরণ হয় না। তাই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ন্যায্যতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
ঋণ পুনর্গঠন নিয়ে আইন পরিবর্তন করা এখন অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে হোল্ডআউট ঋণদাতাদের রুখতে এই সংস্কার প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, নিউইয়র্ক রাজ্যে দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা ঋণের জন্য ধার্য “প্রি-জাজমেন্ট” সুদের হার ১৯৮১ থেকে ৯% ধার্য রয়েছে। তখন মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৮.৯%। আজকের পরিস্থিতিতে এই হার খুব বেশি, তাই ঋণদাতারা নতুন আলোচনা শুরু করতে আগ্রহী নয়। এছাড়া, ঋণ ফেরতের সীমা নির্ধারণের নিয়মও চালু করতে হবে, যাতে ঋণগ্রহণকারী দেশগুলোকে অতিরিক্ত বোঝা না পড়ে।
ঋণ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ঋণের টেকসইতা বিশ্লেষণকে আরও কার্যকর করা। এছাড়া, ঋণগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য একটি “বোয়ারোয়ার্স ক্লাব” গঠন করা উচিত, যা দেশগুলোকে একত্রিত করে সমন্বিতভাবে সমস্যার সমাধান করতে সাহায্য করবে। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সময় ও গভীরতাও বাড়ানো দরকার, যাতে দেশগুলো সমাধান প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত সুযোগ পায়।
২০০০ সালে একটি শক্তিশালী বিশ্বব্যাপী জোট নিম্ন-আয়ের দেশগুলোকে উল্লেখযোগ্য ঋণ ছাড় পেতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে শুধু সেই পরিমাণ পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। এখন আরও বিস্তৃত ও গভীর সংস্কারের প্রয়োজন। এতে শুধু নিম্ন-আয়ের দেশ নয়, মধ্য-আয়ের অনেক দেশও ঋণসংক্রান্ত তাত্ক্ষণিক সমস্যার মুখোমুখি হলে তা মোকাবিলা করতে পারবে। পাশাপাশি এটি ভবিষ্যতে নতুন ঋণ সংকট প্রতিরোধে, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের সমৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করবে।
সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ সভা (UNGA) অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে আমাদের মনোযোগ থাকা উচিত এই বাস্তবমুখী সমাধানগুলো দ্রুত কার্যকর করার দিকে। বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হলে ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর হবে।

