নাগরিকদের নির্বিচারে গুলি করার অভিযোগের ফলে কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, ইসরায়েলি সেনারা যুদ্ধকে এক ধরনের ‘গেমে’ রূপ দিয়েছে।
“বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক সেনাবাহিনী” হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেওয়া ইসরায়েলি সেনারা নিয়মিতভাবে যুদ্ধাপরাধ করছে বলে ইসরায়েলি বিশ্লেষক এবং গাজায় কাজ করা চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
ফিলিস্তিনিদের হত্যাকাণ্ড, প্রহার এবং নির্বিচারে গ্রেপ্তার ইসরায়েলি সেনাদের কাছে নতুন কিছু নয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে ফিলিস্তিনিদের অমানবিক করে তোলা, সেনাবাহিনীতে ডানপন্থী মতাদর্শের অনুপ্রবেশ এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে ইসরায়েলি সেনারা কোনো কার্যকরী কারণ ছাড়াই যা ইচ্ছে তাই করতে পারছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এরেলা গ্রাসিয়ানির মতে, যিনি ২০০০ সালের দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় ইসরায়েলি সেনাদের নৈতিকভাবে “অসাড়” হয়ে যাওয়ার বিষয়ে লিখেছিলেন, এখনকার পরিস্থিতি একেবারেই নতুন।
তিনি বলেন, “ইসরায়েলি সেনারা আগে শিশুদের পাথর ছোড়ার কারণে প্রহার বা গ্রেপ্তার করেছে, এটা নতুন নয়। তবে এবারকার ঘটনা ভিন্ন। আগে অন্তত কিছু নিয়মকানুন ছিল, যদিও তা শিথিলভাবে মানা হতো। কিন্তু এবার আমরা সম্পূর্ণ আলাদা কিছু দেখতে পাচ্ছি।”

খেলায় পরিণত যুদ্ধ-
গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনাদের নির্বিচার নিষ্ঠুরতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
তাদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করেছে যেখানে দেখা যায়, তারা হামলা করা বাড়ির নারীদের পোশাক পরে আছে বা তাদের অন্তর্বাস নিয়ে খেলছে।
আবার এমন ঘটনাও রয়েছে যেখানে নাগরিকদের কেবল “টার্গেট প্র্যাকটিস” বা একঘেয়েমি কাটানোর জন্য গুলি করা হয়েছে।
আগস্টের শুরুতে বিবিসি গাজায় শিশু হত্যার ঘটনা তদন্ত করে। ১৬০টি ঘটনার মধ্যে ৯৫ জন শিশুকে মাথা বা বুকে গুলি করা হয়েছিল—যা শুধু “আঘাত করার উদ্দেশ্য” দাবি করার সুযোগ রাখে না।
শিশু হত্যার পাশাপাশি অভিযোগ রয়েছে, ইসরায়েলি সেনারা খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রগুলোর চারপাশে জড়ো হওয়া নাগরিকদের টার্গেট প্র্যাকটিস হিসেবে ব্যবহার করছে।
ব্রিটিশ সার্জন নিক মেইনার্ড, যিনি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় তৃতীয়বার গিয়েছিলেন, আল জাজিরাকে বলেন, “জিএইচএফ কেন্দ্রগুলো আসলে মৃত্যু ফাঁদ। এগুলোয় পর্যাপ্ত খাবার থাকে একটি পরিবারের কয়েক দিনের জন্য, কিন্তু বাইরে অপেক্ষমাণ হাজারো মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। একসময় তারা ফটক খুলে দেয়, ভিড়, মারামারি এমনকি দাঙ্গা শুরু হয়, আর এটিকে তারা জনতার ওপর গুলি চালানোর যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করে।”
নিক মেইনার্ডের কথায়, নাসের হাসপাতালে চিকিৎসকদের কাছে রোগীদের আঘাতের ধরন থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
“আমি ১২ বছর বয়সী এক ছেলেকে অস্ত্রোপচার করছিলাম, পরে সে মারা যায়,” মেইনার্ড বলেন।
“ওকে জিএইচএফ কেন্দ্রের একটিতে গুলি করা হয়েছিল। জরুরি বিভাগে সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় জানতে পারি, তারা বারবার একই ধরনের আঘাতের ধরণ দেখেছেন,” তিনি যোগ করেন।
এই আঘাতের ধরন বা wound grouping মানে হলো, একদিন অনেক রোগীর একই জায়গায় গুলি লাগা। পরদিন আবার শরীরের অন্য অংশে। এতে মনে হয়, ইসরায়েলি স্নাইপাররা হয় খেলা করছে অথবা সাধারণ নাগরিকদের ব্যবহার করছে নিশানার দক্ষতা বাড়ানোর জন্য।

দায়হীনতা ও নিয়ন্ত্রণহীনতা-
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইসরায়েলি ম্যাগাজিন +972 এক অনুসন্ধানে জানায়, গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের সাধারণ নাগরিকদের গুলি করার ক্ষেত্রে কার্যত কোনো বিধিনিষেধ নেই।
একজন সেনা বলেন, “পুরোপুরি স্বাধীনতা ছিল। যদি হুমকির সামান্য অনুভূতিও হয়, কোনো ব্যাখ্যার দরকার নেই—সরাসরি গুলি করো। কেন্দ্রবিন্দুতে গুলি করা বৈধ, আকাশে নয়।” তিনি আরো বলেন, “সবাইকে গুলি করা বৈধ, হোক সে একটি কিশোরী মেয়ে বা বৃদ্ধা।”
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত গাজা ও পশ্চিম তীরে সেনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে ইসরায়েলি সেনারা মোট ৫২টি তদন্ত চালিয়েছে বলে দাবি করে। কিন্তু Action on Armed Violence (AOAV)–এর তথ্যানুসারে, এর মধ্যে ৮৮ শতাংশ তদন্ত স্থগিত বা কোনো পদক্ষেপ ছাড়াই বন্ধ করে দেওয়া হয়।
শুধু একটি মামলায় দোষীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
Action on Armed Violence (AOAV)–এর মতে, এই ৫২টি ঘটনায় ১,৩০৩ জন নিহত, ১,৮৮০ জন আহত এবং আরো দুজনকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
এমনকি যখন ঘটনার ভিডিও প্রমাণও থাকে, যেমন স্দে তেইমান কারাগারে এক ফিলিস্তিনি বন্দীর গণধর্ষণের ভিডিও, তখনও জনমত এবং মন্ত্রিসভার চাপের কারণে শেষ পর্যন্ত অভিযুক্তরা মুক্তি পেয়ে যায়।
ফিলিস্তিনিদের নির্যাতনের অভিযোগ অন্তত ১৯৬৭ সাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে, যখন রেড ক্রিসেন্ট নাবলুস কারাগারে বন্দীদের ওপর নির্যাতনের নথিপত্র প্রকাশ করেছিল। এছাড়া ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের অমানবিকভাবে উল্লেখ করার প্রবণতা ক্রমেই বেড়েছে।

১৯৬৭ সালেই ইসরায়েলি কূটনীতিক ডেভিড হাখোহেন দাবি করেছিলেন, ফিলিস্তিনিরা মানুষই নয়।
১৯৮৫ সালে হিব্রু শিশু সাহিত্য নিয়ে এক জরিপে দেখা যায়, ৫২০টি বইয়ের মধ্যে ৮৬টিতে ফিলিস্তিনিদের “অমানবিক, যুদ্ধবাজ, প্রতারক দানব, রক্তপিপাসু কুকুর, হিংস্র নেকড়ে বা বিষধর সাপ” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এর ২০ বছর পর, যখন আজকের সেনাদের অনেকে স্কুলে পড়াশোনা করছিল, শিশুদের আঁকা ছবির মধ্যে ১০ শতাংশে ফিলিস্তিনিদের পশু রূপে চিত্রিত করা হয়েছিল।
আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এরেলা গ্রাসিয়ানি বলেন, “ফিলিস্তিনিদের অমানবিক করার প্রক্রিয়া বহু দশক ধরে চলেছে। তবে এখন তা সম্পূর্ণ হয়েছে। ৭ অক্টোবরের হামাস–নেতৃত্বাধীন আক্রমণের প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলি সেনাদের প্রথম দিন থেকেই ভীষণ নিষ্ঠুর আচরণ করতে দেখা গেছে।”
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নিয়ে লেখা An Army Like No Other গ্রন্থের লেখক হাইম ব্রেশিথ বলেন, “এটা এক তুষারগোলার মতো, যে পাহাড় বেয়ে গড়াচ্ছে, আর যার কোনো শেষ নেই। প্রতি বছর সহিংসতা আরও বেড়েই চলেছে। নাগরিকদের টার্গেট প্র্যাকটিসে ব্যবহার করাই এর যৌক্তিক পরিণতি।”
তিনি আরো বলেন, “এটা এক নতুন খেলা, এক রক্তের খেলা, আর এই খেলাগুলো সবসময় নিচ থেকে শুরু হয়। এটা বিকৃত, হত্যাপ্রবণ এবং অসুস্থ মানসিকতার প্রকাশ।”

