ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসে সপ্তাহখানেক আগে অনুষ্ঠিত হলো এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। এতে অংশ নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডেরিখ মার্জ, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লায়েনসহ ইউরোপীয় নেতারা। বৈঠকে সরাসরি উপস্থিত না থেকেও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে। এমনকি বৈঠকের মধ্যেই ট্রাম্প ফোনে কথা বলেন তাঁর সঙ্গে।
বৈঠক শেষে ট্রাম্পসহ অন্যান্য নেতারা বলেন, আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে এবং ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তায় তাঁরা একমত হয়েছেন। সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগে পুতিন-জেলেনস্কির দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং পরে ট্রাম্পকে যুক্ত করে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজন করা হবে। তবে জেলেনস্কি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি পুতিনের সঙ্গে বসতে রাজি, কিন্তু কোনো শর্ত মেনে নয়। পরিস্থিতি এখন এমন যে, তাঁর সামনে দুটি কঠিন পথ—একদিকে রাজনৈতিক আত্মহত্যা, অন্যদিকে রাশিয়ার কাছে আরও বেশি ভূখণ্ড হারানোর আশঙ্কা।
জেলেনস্কির রাজনৈতিক যাত্রা অনেকটা নাটকীয়। ২০১৫ সালে তিনি অভিনয় করেছিলেন ‘সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল’ সিরিজে, যেখানে এক শিক্ষক হঠাৎ প্রেসিডেন্ট হয়ে যান। সেই জনপ্রিয়তা থেকেই গড়ে ওঠে রাজনৈতিক দল, এবং ২০১৯ সালে তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন প্রেসিডেন্ট হিসেবে। তবে তখন তিনি কল্পনাও করেননি, তাঁর সামনে আসবে এমন ভয়াবহ যুদ্ধ।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ইউক্রেন স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই রাশিয়ার নজরদারিতে ছিল। জেলেনস্কি ক্ষমতায় আসার পর ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার প্রচেষ্টা মস্কোকে আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। রাশিয়া এটিকে তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। ফলেই শুরু হয় যুদ্ধ, যা চলছে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে। ইতিমধ্যে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড রুশ দখলে চলে গেছে। প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি ছাড়াও ইউরোপজুড়ে শরণার্থী সংকট দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের খরচ বহন করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো বিপুল অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দিয়েছে।
সম্প্রতি আলাস্কায় পুতিনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা জানান ট্রাম্প। ভিডিওচিত্রগুলোতে পুতিনকে দেখা গেছে বেশ নির্ভার ভঙ্গিতে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আত্মবিশ্বাসই প্রমাণ করে, তিনি নিজেকে বিজয়ের কাছাকাছি মনে করছেন। হোয়াইট হাউস বৈঠকের পরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধ করতে চাইছে শর্তসাপেক্ষে। পুতিনের মূল দাবি দনবাস অঞ্চল—দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক, যেখানে রয়েছে খনিজ সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থান। ক্রিমিয়ার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ এবং কৃষ্ণসাগরে আধিপত্য বাড়াতেও এই অঞ্চল রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
যদি জেলেনস্কি দনবাস অঞ্চল রাশিয়াকে দেন, তবে তা হবে ইউক্রেনীয় জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। তিন বছরের বেশি সময় ধরে যে মানুষগুলো জীবন দিয়েছে দেশের অখণ্ডতার জন্য, তাঁদের আত্মত্যাগ অর্থহীন হয়ে পড়বে। আবার যদি তিনি পুতিনের শর্ত প্রত্যাখ্যান করেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি থাকবে। ট্রাম্প হয়তো তখন ইউক্রেন ইস্যু থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। ফলেই বাড়তে পারে রুশ আগ্রাসন, এমনকি পুরো ইউক্রেনেই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব ইউরোপকেও নাড়িয়ে দিতে পারে, যেখানে ইতিমধ্যেই পুতিনপন্থী শক্তির উত্থান দেখা যাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। জেলেনস্কির সামনে যে দুটি ভয়ংকর বিকল্প দাঁড়িয়ে আছে, তিনি কোনোটি-ই চান না। এখন সবার চোখ পুতিন-জেলেনস্কি ও ট্রাম্প-পুতিন-জেলেনস্কি বৈঠকের দিকে। সেখানেই নির্ধারিত হতে পারে ইউক্রেন যুদ্ধের পরবর্তী অধ্যায়।

