ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে দেশ থেকে আটক করে ‘বের করে আনা হয়েছে’ বলে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একটি বড় আকারের সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া একাধিক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, “ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ চালিয়ে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।” তবে ট্রাম্পের এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
ট্রুথ সোশ্যালের একটি পোস্টে বলা হয়, “যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে ভেনেজুয়েলা এবং এর নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে একটি বৃহৎ পরিসরের অভিযান পরিচালনা করেছে। প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীকে-সহ আটক করা হয়েছে এবং দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই অভিযানটি যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সম্পন্ন করা হয়েছে। বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে। (স্থানীয় সময়) আজ সকাল ১১টায় মার-আ-লাগোতে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এই বিষয়ে আপনাদের মনোযোগের জন্য ধন্যবাদ!”
ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো এস্টেট থেকে সকাল ১১টায় ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি সেখানে ছুটি কাটাচ্ছিলেন বলে জানানো হয়েছে।
শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর হামলার সময় বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, রাজধানী কারাকাসে অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় সময় রাত ২টার দিকে নিচু দিয়ে উড়তে থাকা বিমানের উপস্থিতির কথাও জানানো হয়।
ভেনেজুয়েলার সরকার এক বিবৃতিতে জানায়, হামলায় কারাকাস শহরের বেসামরিক ও সামরিক এলাকা, পাশাপাশি মিরান্ডা, আরাগুয়া ও লা গুয়াইরা রাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিস্ফোরণের আগে “চলমান সামরিক তৎপরতার” কারণে ভেনেজুয়েলার আকাশসীমায় মার্কিন বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ)। হামলার লক্ষ্যবস্তু বা অভিযানের উদ্দেশ্য নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেনেজুয়েলার বহু নাগরিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা ও আকাশে সামরিক তৎপরতা দেখার কথা জানিয়েছেন। হতাহতের সংখ্যা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এপি জানায়, হামলাগুলো ৩০ মিনিটেরও কম সময় ধরে চলেছে।
হামলার পর ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের মাসব্যাপী চাপ প্রয়োগের কৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
ভেনেজুয়েলা সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, “এই হামলার উদ্দেশ্য ভেনেজুয়েলার কৌশলগত সম্পদ—বিশেষ করে তেল ও খনিজ সম্পদ—দখল করা এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভাঙা। এই ষড়যন্ত্র সফল হবে না।”
এরপরই এলো ট্রুথ সোশ্যালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি পোস্ট, যেখানে বলা হয়েছে— (ভেনেজুয়েলা প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীকে-সহ আটক করা হয়েছে এবং দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে)।
এর আগে শুক্রবার ভেনেজুয়েলা জানায়, মাদক পাচারবিরোধী সহযোগিতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তারা উন্মুক্ত। বৃহস্পতিবার প্রচারিত এক পূর্ব-রেকর্ড সাক্ষাৎকারে মাদুরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তন ঘটাতে এবং দেশটির বিশাল তেলভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার পেতে চায়।
গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলায় মাদক চোরাচালানকারীদের ব্যবহৃত একটি ডকিং এলাকায় ড্রোন হামলার পেছনে সিআইএ জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়। সেপ্টেম্বরে সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌকায় মার্কিন হামলা শুরু হওয়ার পর এটিই দেশটিতে প্রথম সরাসরি বড় সামরিক অভিযান বলে জানানো হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কয়েক মাস ধরেই ভেনেজুয়েলার লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুমকি দিয়ে আসছিলেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে মাদকের প্রবাহ ঠেকাতে নৌকায় হামলা প্রয়োজন।
শুক্রবার পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এসব নৌকা হামলার সংখ্যা ৩৫টি এবং নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ১১৫ জন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার উপকূলে অনুমোদিত তেল ট্যাংকার জব্দ করে এবং আরো জাহাজ অবরোধের নির্দেশ দেয়।
নভেম্বরে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের নির্দেশে মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে উন্নত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড এ অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়।
২০১৯ সাল থেকে বন্ধ থাকা ভেনেজুয়েলায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের ওয়েবসাইটে দেশটিতে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করে বলা হয়েছে, তারা “কারাকাস ও আশপাশে বিস্ফোরণের খবর সম্পর্কে অবগত” এবং সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
এফএএ সব বাণিজ্যিক ও বেসরকারি মার্কিন পাইলটকে সতর্ক করে জানায়, ভেনেজুয়েলা ও কুরাকাওয়ের আকাশসীমা চলমান সামরিক কার্যকলাপের কারণে ফ্লাইট নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং তা এড়িয়ে চলতে হবে।

