ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, এখন থেকে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতা ও জ্বালানি তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। তিনি আরো জানান, মার্কিন কম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে।
মাদুরোকে আটক করার ক্ষেত্রে ট্রাম্প যে অভিযোগটি করে আসছিলেন তা হচ্ছে— যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অস্ত্র পাচার করছে তাঁর প্রশাসন। কিন্তু আটকের পর ট্রাম্প রাখঢাক না রেখে জানিয়ে দিলেন, তাঁর লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল ভাণ্ডার। সঙ্গে বাড়তি প্রাপ্তি হিসেবে রয়েছে গ্যাস।
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাব অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার খনিতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের মজুদ। যার পরিমাণ ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বিশ্বজুড়ে খনিগুলোতে থাকা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ। এই খনি থেকে উত্তোলন হচ্ছে সামান্যই।
প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করে ভেনেজুয়েলা। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে প্রতিদিন যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল সরবরাহ আসে, তার মাত্র ০.৮ শতাংশ আসে ভেনেজুয়েলা থেকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি তেলের বিশাল মজুদ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। তার পরও ভেনেজুয়েলার তেলে কেন তাদের আগ্রহ? এর কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের তেল হালকা, এ ধরনের অপরিশোধিত তেলকে বলা হয় ‘সুইট ক্রুড’।
এ ধরনের তেল গ্যাসোলিন জাতীয় জ্বালানি তৈরির জন্য খুবই উপযোগী, তবে এর বেশি আর তেমন কোনো কাজে আসে না। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল ভারী ও ঘন। এই তেল উত্তোলন ও পরিশোধনের ক্ষেত্রেও অন্যান্য তেলের তুলনায় বেশি যত্নশীল হতে হয়।
তবে এ ধরনের তেল পরিশোধনের মাধ্যমে উত্কৃষ্টমানের ডিজেল, অ্যাসফল্ট, কারখানায় ব্যবহারের উপযোগী জ্বালানি, অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতিতে ব্যবহারের উপযোগী জ্বালানিসহ আরো অনেক ধরনের জ্বলানিপণ্য তৈরি করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের দেশের রাস্তায় চলাচল করা গাড়িগুলোয় নিয়মিত পেট্রল সরবরাহ করতে চায়, তাহলে তাদের এই ভারী অপরিশোধিত তেলের ওপরই নির্ভর করতে হবে।
এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মার্কিন পরিশোধনাগারগুলোকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন হবে হাজার হাজার কোটি ডলার। এ কারণে নিকট ভবিষ্যতে কেউই তা করতে বিশেষ আগ্রহী নয়।
কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ভূখণ্ড থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করলেও ভারী তেলের চাহিদা মেটাতে দেশটিকে এখনো পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত অধিকাংশ হালকা অপরিশোধিত তেল বিদেশে রপ্তানি করা হয়। অথচ টেক্সাস ও লুইজিয়ানার পরিশোধনাগারগুলো চালু রাখতে তাদের প্রতিদিন ছয় হাজার ব্যারেলের বেশি ভারী তেল আমদানি করতে হয়। এ বাস্তবতা মাথায় রাখলেই সমীকরণ মেলানো সম্ভব। এ সমীকরণ অনিবার্যভাবে ভেনেজুয়েলার দিকেই নিয়ে যায়। কেননা, কানাডা ও রাশিয়ার পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভারী তেলের মজুদ ভেনেজুয়েলায়।
তা ছাড়া ভেনেজুয়েলা দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের দেশ হওয়ায় ভৌগোলিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কাছাকাছি। ফলে সেখান থেকে তেল নিয়ে আসতে পরিবহন ব্যয়ও অনেক কম পড়বে।
- তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন বিজনেস, বিবিসি

