ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে ‘বোর্ড অব পিস’ নামে নতুন একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ চালু করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ এতে যোগ দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র ও বড় বৈশ্বিক শক্তিগুলো এখনো বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার ২২ জানুয়ারি এই বোর্ডের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন ট্রাম্প। তবে শুরু থেকেই এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কূটনৈতিক মহলের একটি অংশ আশঙ্কা করছে, নতুন এই বোর্ড জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক কর্তৃত্বকে দুর্বল করে দিতে পারে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, বোর্ডটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেবেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, বোর্ডটি পুরোপুরি গঠিত হলে তারা প্রায় যে কোনো বিষয়েই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন। একই সঙ্গে জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করা হবে বলে দাবি করেন তিনি।
ট্রাম্প আরও বলেন, জাতিসংঘের সম্ভাবনা অনেক হলেও এখনো তা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। তাঁর ভাষায়, গাজার যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায়ও এই বোর্ড কাজ করবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য থেকেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে বোর্ডটি ভবিষ্যতে বৈশ্বিক কূটনীতি ও সংঘাত নিরসনের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে জাতিসংঘের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব ও কাতারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশগুলোর পাশাপাশি উদীয়মান শক্তি ইন্দোনেশিয়া ইতোমধ্যে বোর্ডে যোগ দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত পশ্চিমা মিত্র ও বড় বৈশ্বিক শক্তিগুলো এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, বোর্ডের স্থায়ী সদস্যদের প্রত্যেককে এক বিলিয়ন ডলার করে তহবিলে দিতে হবে। রয়টার্স জানায়, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্বের প্রধান শক্তি, ইসরাইল বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, বোর্ডের মূল লক্ষ্য হবে গাজার শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। তবে ভবিষ্যতে এটি বিশ্বের অন্যান্য সংকটেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া এখনো কেউ এই বোর্ডে যোগ দেয়নি। রাশিয়া জানিয়েছে, তারা বিষয়টি বিবেচনা করছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ করা রুশ সম্পদ থেকে এক বিলিয়ন ডলার দিতে তারা প্রস্তুত।
ফ্রান্স এই বোর্ডে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ব্রিটেন জানিয়েছে, আপাতত তারা এতে যুক্ত হচ্ছে না। চীন এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। জাতিসংঘের এক মুখপাত্র বলেছেন, নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব অনুযায়ী গাজা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বোর্ডের সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা থাকবে।
বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন মার্কো রুবিও, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, গাজা বিষয়ক আলোচক স্টিভ উইটকফ এবং সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। কুশনার জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপে গাজার পুনর্গঠন ও হামাসের নিরস্ত্রীকরণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠবে। তাঁর মতে, হামাস নিরস্ত্রীকরণ ছাড়া এই পরিকল্পনা এগোনো কঠিন।
এদিকে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। ফিলিস্তিনি কমিটির প্রধান আলি শাআথ জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে মিসরের সঙ্গে রাফাহ সীমান্ত পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। তবে গত বছরের অক্টোবরে হওয়া যুদ্ধবিরতি এর আগেও একাধিকবার ভেঙে পড়েছে। ইসরাইল ও হামাস একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে।
ইসরাইলের অভিযোগ, হামাস এখনো এক জিম্মির লাশ ফেরত দেয়নি। অন্যদিকে হামাসের দাবি, ইসরাইল গাজায় ত্রাণ প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। ফিলিস্তিনি দলগুলোও ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং গাজা শাসনের জন্য একটি অন্তর্বর্তী কমিটিকে সমর্থন দিয়েছে।
তবে যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, গাজার নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ এবং ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের মতো জটিল ইস্যুগুলো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

