সিরিয়ার হাসাকা প্রদেশের আল-হোল কারাগার শিবিরে এখন থমথমে শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। কয়েক দিন আগে সেখানে বিশৃঙ্খলার দৃশ্য দেখা যায়, যখন কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই সরে যাওয়ার পর গণপলায়ন ঘটে।
কয়েক ঘণ্টার জন্য ইসলামিক স্টেট (আইএস) যোদ্ধাদের সন্দেহভাজন স্বজনদের নিয়ে গঠিত এই শিবিরটি সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিল। সরকার বাহিনী আল-হোলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পৌঁছানোর আগেই আটক ব্যক্তিরা ঘেরাটোপ ভেঙে পালানোর চেষ্টা করে।
“সরকারি বাহিনী আসার সময় এসডিএফ সেনারা চলে যায়,” বলেন ১৮ বছর বয়সী ইয়াহিয়া, যিনি ছয় বছর ধরে আল-হোলে আছেন। “আমরা বেড়া টপকে বেরিয়ে পড়ি।”
সরকারিভাবে আল-হোলে কোনো গণপলায়নের কথা স্বীকার করা হয়নি। তবে শিবিরের ভেতর থেকে পাওয়া সাক্ষ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।

ইয়াহিয়া সূত্র সংবাদমাধ্যমকে জানান, তার এক প্রতিবেশীসহ কয়েকজন আটক ব্যক্তি পালাতে সক্ষম হয়। তিনি নিজে অবশ্য পরে ফিরে আসেন।
বেড়ার কিছু অংশে ফাঁক তৈরি হয়েছিল, আর কথিত আছে, পাচারকারীরা এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে গোপনে বের করে নেওয়ার ব্যবস্থা করে।
বুধবার এসডিএফের কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের পর সিরীয় সরকারি বাহিনী কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত এই শিবিরে প্রবেশ করে। এসডিএফ সাত বছর ধরে এই স্থাপনাটি পরিচালনা করছিল। দামেস্ক শিবিরটি নিরাপদ রাখার অঙ্গীকার করে।
শিবিরবাসীরা জানান, আটক ও স্থানান্তর করা হলেও কেন তাদের আটক করা হয়েছে সে বিষয়ে খুব কম বা কোনো তথ্যই দেওয়া হয়নি।
বেড়ার ভেতরে ব্যাপকভাবে অন্যায়ের অনুভূতি বিরাজ করছে।
“আমার আত্মীয়দের মধ্যে আইএসের সঙ্গে যুক্ত কেউ আছে,” স্বীকার করেন ৪৮ বছর বয়সী আটক মা উম জেইনাব। “কিন্তু আমি কখনো এর অংশ ছিলাম না।”
২১ জানুয়ারি বেড়ার ওপরে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আটক ব্যক্তি কৌশলটি স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা শিবিরটিকে বসবাসের অযোগ্য করতে চাই, যাতে তারা বাধ্য হয়ে আমাদের সরিয়ে নেয়।”

‘এখানে আমরা শুধু অপেক্ষা করি’
কাছেই শিশুরা কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে সৈন্যদের চলাচল দেখছিল। কেউ কেউ শিবিরেই জন্মেছে, অন্যরা এর বাইরে খুব কমই কিছু জানে।
কয়েক দিন ধরে গুজব ছড়াচ্ছিল যে প্রহরীরা চলে যাচ্ছে এবং কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
“আমরা ভেবেছিলাম আমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে,” বলে ১৪ বছর বয়সী আনাস। “এখানে আমরা শুধু অপেক্ষা করি।”

আল-হোলে প্রায় ২৪ হাজার মানুষ রয়েছে, যার মধ্যে আনুমানিক ১৫ হাজার সিরীয় এবং ৪২টি দেশের ৬ হাজার ৩০০ নারী ও বিদেশি শিশু। আইএস-সম্পৃক্ত বিশ্বের বৃহত্তম অনানুষ্ঠানিক আটক কেন্দ্রগুলোর একটি হিসেবে এটি পরিচিত। কুর্দি নিয়ন্ত্রিত আইএস আটক কেন্দ্রগুলো তড়িঘড়ি করে সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার পর এটি বড় উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
এক সরকারি কর্মকর্তা সূত্র সংবাদমাধ্যমকে জানান, সিরীয় বাহিনী তাদের দখলে নেওয়া শিবিরগুলো নিরাপদ করেছে এবং পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধারে কাজ করছে।
তিনি বলেন, “পরিস্থিতি ঠিক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমরা জানি এই শিবিরগুলোর ভেতরে উগ্রপন্থায় ঝুঁকে পড়ার অন্যতম বড় কারণ হলো নাজুক জীবনযাপন পরিস্থিতি।”
তিনি আরো জানান, সরকার জাতিসংঘ সংস্থা ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোকে শিবিরে থাকা মানুষদের সহায়তায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা শুক্রবার জানায়, আল-হোলে দুর্বল নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তাদের কর্মীরা সেখানে প্রবেশ করতে পারেননি।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আইএসবিরোধী লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের প্রধান অংশীদার এসডিএফ ২০১২ সাল থেকে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে সিরীয় সরকারি বাহিনীর দ্রুত অগ্রযাত্রার মুখে পড়েছে।
ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে ১৮ জানুয়ারি এসডিএফ দামেস্কের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে ধাপে ধাপে পুরো অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হয়।
আল-হোল থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি কারাগার কমপ্লেক্সে এই হস্তান্তর দ্রুতই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
আরেকটি বিস্ফোরণপ্রবণ কেন্দ্র
আল-শাদ্দাদি কারাগার শিবিরে মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই মাটিজুড়ে পড়ে থাকা কমলা রঙের কারাবন্দি পোশাকের সারি দেখা যায়, যা সোজা সেল পর্যন্ত বিস্তৃত।
কংক্রিটের এই কমপ্লেক্সের ভেতরে, যেখানে আইএসের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে পুরুষদের রাখা হতো, সেলের দরজাগুলো উপড়ে ফেলা হয়েছিল।
প্রথম সেলে মেঝেতে পড়ে ছিল টাটকা রুটির টুকরো ও আধাখাওয়া কমলা। ১০ জন রাখার জন্য তৈরি কক্ষগুলোতে কখনো কখনো ৩০ থেকে ৪০ জনকে রাখা হতো। ভবনটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জীর্ণ ও আংশিকভাবে পানিতে ডুবে ছিল; স্যাঁতসেঁতে গন্ধে ভরা।
এসডিএফের কাছ থেকে কারাগারটি দখলে নেওয়ার সময় সেখানে কোনো আটক ব্যক্তি অবশিষ্ট ছিল না।
বর্তমানে স্থাপনাটির দায়িত্বে থাকা প্রায় ২০ জন সৈন্য তাদের বর্ণনা দেন। তাদের মতে, দায় স্পষ্ট।

“চলে যাওয়ার আগে এসডিএফ আমাদের বিভ্রান্ত করতে, বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিতে এবং পালাতে বন্দিদের ছেড়ে দেয়,” বলেন স্থাপনার নিরাপত্তা প্রধান এবং সিরীয় সেনাবাহিনীর ৪৪তম ডিভিশনের সদস্য আবু ওমর।
সরকারি বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, হস্তান্তরের সময় আল-শাদ্দাদি থেকে ১২০ জন আটক ব্যক্তি পালায়। সঠিক পরিস্থিতি এখনও অস্পষ্ট।
আবু ওমর বলেন, এর মধ্যে ৮১ জনকে পরে শহর থেকে পুনরায় আটক করা হয়েছে, আর ৩৯ জন এখনও পলাতক। যারা পালিয়েছে বা পরে ধরা পড়েছে, তাদের মধ্যে উত্তর আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যক্তিরাও রয়েছে বলে সৈন্যরা জানান।
“কেউ কেউ বিদেশি উচ্চারণে কথা বলে,” বলেন এক সৈন্য। তিনি আরও জানান, পরবর্তীতে এসডিএফ বাহিনীর সঙ্গে প্রায় সাত ঘণ্টা সংঘর্ষ চলে।
“তারা চুক্তি ভেঙেছে। এটা প্রথমবার নয়,” তিনি বলেন।
এসডিএফ অভিযোগটি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, কোনো বন্দিকে স্বেচ্ছায় মুক্তি দেওয়া হয়নি; বরং অন্য বাহিনী কারাগারে হামলা চালায় বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, যার ফলে কিছু বন্দি পালিয়ে যায়।
এসডিএফ এমন কিছু ছবিও প্রকাশ করেছে, যেগুলোতে বন্দি মুক্তির দৃশ্য দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়, তবে সেগুলো আল-শাদ্দাদি কারাগারের সঙ্গে মিলছে না।
এক স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারি বাহিনী আসার আগেই এসডিএফবিরোধী বেদুইন গোত্রের সদস্যরা কারাগারের আশপাশে উপস্থিত ছিল এবং বন্দিদের “অন্যায়ভাবে আটক” মনে করে তারা ফটক ভেঙে দেয়।

‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’
স্থাপনাটিতে আবু আমর ও তার লোকজন আইএসের প্রতি তাদের দীর্ঘদিনের বৈরিতার কথা তুলে ধরেন।
“আমরা ২০১৩ সাল থেকেই তাদের সঙ্গে লড়ছি,” তিনি বলেন।
তার অধিকাংশ সৈন্য সাবেক ফ্রি সিরিয়ান আর্মি থেকে আসা, বিশেষ করে জাবহাত থুওয়ার সুরিয়া গোষ্ঠীর, যা ইদলিবে গঠিত হয়েছিল এবং উত্তর সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে।
তাদের দাবি, তথাকথিত “খেলাফত” ঘোষণার অনেক আগেই তারা এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর মুখোমুখি হওয়া প্রথম দিকের বাহিনীগুলোর একটি ছিল।

সৈন্য আবু আল-হাসান বলেন, তিনি ২০১৩ সালে আইএসের গণহত্যা থেকে বেঁচে যান, যেখানে ধরা পড়া ৪৬ জনের মধ্যে মাত্র তিনজন জীবিত ছিল। আবু আমর ২০১৫ সালে আইএস স্নাইপারের গুলিতে তার ভাইকে হারান।
“তাদের চোখে আমরা ‘মুরতাদ’, বিশ্বাসঘাতক মুসলমান, কারণ আমরা তাদের খেলাফত প্রত্যাখ্যান করি,” তিনি বলেন।
নিরাপত্তা রূপান্তরের সময় গণপলায়ন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ২১ জানুয়ারি উচ্চঝুঁকির আইএস আটক ব্যক্তিদের স্থানান্তর শুরু করে এবং প্রায় ১৫০ জন বন্দিকে উড়িয়ে ইরাকের নিরাপদ স্থাপনায় নিয়ে যায়।
সামরিক কর্মকর্তারা জানান, একটি বৃহত্তর জরুরি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় আটক প্রায় ৭ হাজার বন্দিকে শেষ পর্যন্ত স্থানান্তর করা হতে পারে। এই উদ্যোগের পেছনে উদ্বেগ হলো—চাপের মুখে আটক ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে ব্যাপক পালানো এবং সিরিয়া ও তার বাইরেও নতুন করে বিদ্রোহী তৎপরতার হুমকি তৈরি হতে পারে।
উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার বিভিন্ন আটক কেন্দ্রে প্রায় ৯ হাজার আইএস-সম্পৃক্ত বন্দি রাখা হয়েছিল, যাদের একটি বড় অংশকে অত্যন্ত বিপজ্জনক জঙ্গি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কর্তৃপক্ষ বলছে, আল-শাদ্দাদিতে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তবে ভেতরের কিছু সূত্র সরকারি বর্ণনার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
মিডল ইস্ট আই অনুসারে, এক সিরীয় সামরিক সূত্র বলেন, “পালানোর সংখ্যাটি প্রবেশপথে পাওয়া কারাগারের রেজিস্টারের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই আরও জঙ্গি এখনো পলাতক রয়েছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।”
সিরিয়ার আল-হোল ও আল-শাদ্দাদি কারাগার শিবিরগুলোতে কুর্দি বাহিনী এসডিএফ-এর সরে যাওয়ার পর আটক ব্যক্তিদের গণপলায়ন ঘটেছে, কিছু বন্দি এখনও পলাতক। সরকার শিবিরে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে, তবে নিরাপত্তা ও আইএস সংশ্লিষ্ট বন্দিদের পুনরায় আটক বিষয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। লন্ডন থেকে ‘আরিব উল্লাহ’র অতিরিক্ত প্রতিবেদন । সূত্র: মিডল ইস্ট আই

