ইরানকে ঘিরে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েনের, তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই উত্তেজনা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইরানের সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র আগেও করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার দুই মেয়াদেই ইরানে বিক্ষোভ উস্কে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট কংগ্রেসে স্বীকার করেন, ইরানে কৌশলে ডলার সংকট তৈরি করা হয়েছিল, যাতে মানুষ বিক্ষোভে রাস্তায় নামে।
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগ সামরিক ঘাঁটিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে সেটাই সবচেয়ে ভালো হবে। এই মন্তব্য নতুন করে কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করেছে।
দুই মার্কিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে শনিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ইরানের ওপর কয়েক সপ্তাহ ধরে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্দেশ দিলেই এ অভিযান শুরু হতে পারে। বর্তমানে দুই দেশ আগের চেয়ে অনেক বেশি ও গুরুতর সংঘাতের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবিতে মেলবোর্ন, অ্যাথেন্স, টোকিও, লন্ডনসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বড় বিক্ষোভ হয়েছে।
ট্রাম্প এ অঞ্চলে সেনাসদস্যের সংখ্যা বাড়ানো এবং রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন মোতায়েনের পর নতুন হামলার শঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে। এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন তেহরান ও ওয়াশিংটন পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়াবে বলেও জানিয়েছে।
অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইরানকে চীনের কাছে তেল বিক্রি কমাতে চাপ দেওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চীনে ইরানের তেল রপ্তানি কমাতে কাজ করার বিষয়ে কর্মকর্তাদের ব্রিফ করেছে।
এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগে একমত হয়েছে। বিশেষ করে চীনে যাতে ইরান তেল বিক্রি কমায়, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার জানায়, আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত দেশগুলোর মধ্যে স্বাভাবিক সহযোগিতা যুক্তিসংগত ও বৈধ। এ প্রক্রিয়াকে সম্মান ও সুরক্ষিত করা উচিত। বর্তমানে ইরানের তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি যায় চীনে।
মিউনিখ সম্মেলনে ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহর নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভি বলেছেন, তিনি দেশটিতে একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ’ গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই সম্মেলনকে ‘সার্কাসে পরিণত হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন।
সব উত্তেজনার মধ্যেও আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তখত-রাভানচি বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে ইচ্ছুক হলে ইরান ছাড় দিয়ে পারমাণবিক চুক্তি করতে প্রস্তুত।
শনিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ট্রাম্প একটি চুক্তি চান, তবে সেটি বাস্তবায়ন কঠিন মনে হচ্ছে।
মাজিদ বলেন, বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে। তারা যদি আন্তরিক হয়, তাহলে চুক্তির পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। তিনি আরও জানান, আলোচনা কমবেশি ইতিবাচক দিকে এগিয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ৪০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করছে কিনা জানতে চাইলে মাজিদ বলেন, “এটি একটি ভিন্ন খেলা হবে।”
ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। যুদ্ধ এড়াতে তারা ট্রাম্পের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেছেন।
একদিকে সামরিক প্রস্তুতির খবর, অন্যদিকে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা—এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।
জেনেভায় মঙ্গলবার দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনা হওয়ার কথা জানিয়েছে ইরান। তবে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি ও তেল রপ্তানি নিয়ে চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে—এই সংকট কূটনীতির টেবিলে সমাধান হবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য নতুন সংঘাতের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

