রবি নদীর উদ্বৃত্ত পানি পাকিস্তানে প্রবাহিত হওয়া বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে ভারত। গ্রীষ্মের প্রাক্কালে এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের পানি সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) জম্মু ও কাশ্মীরের মন্ত্রী জাভেদ আহমেদ রানার বরাতে এনডিটিভি জানায়, সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত হওয়ার পর পাঞ্জাব-জম্মু ও কাশ্মীর সীমান্তে শাহপুর কান্দি বাঁধ প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়েছে এবং এখন তা সমাপ্তির পথে।
শাহপুর কান্দি বাঁধ চালু হলে রবি নদীর অতিরিক্ত পানি আর পাকিস্তানে প্রবাহিত হবে না। বর্তমানে রবি নদীর উদ্বৃত্ত পানি মাধোপুর হয়ে ভাটির দেশ পাকিস্তানে পৌঁছায়। নতুন বাঁধের মাধ্যমে সেই পানি পাঞ্জাব ও জম্মু ও কাশ্মীরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
রানা বলেন, প্রকল্পের কাজ ৩১ মার্চের মধ্যে শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। এরপর ওই পানি খরাপ্রবণ কাঠুয়া ও সাম্বা জেলায় সরবরাহ করা হবে। তার ভাষায়, “পাকিস্তানে যাওয়া উদ্বৃত্ত পানি বন্ধ করা হবে। এটি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। কাঠুয়া ও সাম্বা জেলা খরাকবলিত এলাকা, এবং এই প্রকল্প আমাদের অগ্রাধিকার।”
রবি নদীর পানি পাকিস্তানে যাওয়া বন্ধ করার লক্ষ্যে শাহপুর কান্দি বাঁধ প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। ১৯৮২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
তবে পাঞ্জাব ও জম্মু ও কাশ্মীর সরকারের মধ্যে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কারণে নির্মাণকাজ থমকে ছিল। ২০০৮ সালে এটিকে জাতীয় প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
৩ হাজার ৩৯৪ কোটি ৪৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পের ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ২ হাজার ৬৯৪ কোটি ২ লক্ষ টাকা বহন করছে পাঞ্জাব সরকার এবং অবশিষ্ট ২০ শতাংশ অর্থাৎ ৭০০ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা দিচ্ছে ভারত সরকার।
বাঁধটির উচ্চতা ৫৫ দশমিক ৫ মিটার এবং এতে ৭ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি হাইডেল চ্যানেল রয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্পটি পাঞ্জাবের প্রায় ৫ হাজার হেক্টর এবং জম্মু ও কাশ্মীরের কাঠুয়া ও সাম্বা জেলায় ৩২ হাজার ১৭৩ হেক্টরের বেশি জমিতে সেচ সুবিধা দেবে।
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল পহেলগামে পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীদের হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পরদিন ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করে।
১৯৬০ সালের পর এই প্রথম ভারত পানি সহযোগিতার বিষয়টিকে সরাসরি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নীতি ও সন্ত্রাসবাদের প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করল। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পাশাপাশি এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
চুক্তি অনুযায়ী, সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদীর পানি ব্যবহারের অধিকার ছিল পাকিস্তানের। আর রবি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর ওপর ছিল ভারতের অধিকার।
সাবেক সেচমন্ত্রী তাজ মহিউদ্দিন বলেন, রবি নদীর ওপর ভারতের একচ্ছত্র অধিকার রয়েছে, তাই এই বাঁধের কার্যক্রম সিন্ধু পানি চুক্তির আওতায় পড়ে না।
পাকিস্তানের কৃষিখাতের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ সিন্ধু নদ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। দেশটির পানি সঞ্চয় সক্ষমতা মাত্র এক মাসের প্রবাহের সমান। ফলে রবি নদীর উদ্বৃত্ত পানি বন্ধ হলে পাকিস্তানের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
চুক্তি স্থগিত থাকার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্র সরকার সিন্ধু অববাহিকায় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সাওয়ালকোট, রাতলে, বুরসার, পাকাল দুল, কাওয়ার, কিরু এবং কিরথাই ১ ও ২ প্রকল্প। চলতি মাসের শুরুতে সাওয়ালকোট প্রকল্পের কাজ ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শাহপুর কান্দি বাঁধের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হলে রবি নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে। তবে এই সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
গ্রীষ্ম ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পানি নিয়ে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে নতুন উত্তেজনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

