রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস পবিত্র রমজান আবারও এসেছে। কিন্তু ফিলিস্তিনের গাজায় এই আগমন স্বাভাবিক কোনো উৎসবের মতো নয়। ইসরাইলি আগ্রাসনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত ভূমিতে, উদ্বাস্তু শিবিরের সংকীর্ণ তাঁবুতেই রমজানকে স্বাগত জানাতে হচ্ছে হাজারো পরিবারকে।
মধ্য গাজার বুরেজ শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা মাইসুন আল-বারবারাউই তাদের একজন। জীর্ণ একটি তাঁবুই এখন তার ঘর। ছেঁড়া ছাদের নিচে ঝুলছে সাধারণ কিছু রঙিন সাজসজ্জা। কাপড়ের দেয়ালে শিশুদের আঁকা রঙিন নকশা। শিবিরের বাসিন্দারাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তৈরি করেছেন এসব। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝেই রমজানের ছোট্ট এক টুকরো আনন্দ।
মাইসুন তার ৯ বছর বয়সী ছেলে হাসানকে হাসিমুখে বললেন, “আমি তোমার জন্য সাজসজ্জার সরঞ্জাম আর একটা ছোট্ট ফানুস এনেছি।”
সেই হাসিতে ছিল ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু ছিল সন্তানের মুখে আনন্দ দেখার তৃপ্তিও। যুদ্ধ, ক্ষতি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে ছেলেকে একটি রমজানের ফানুস কিনে দিতে পারাটাই যেন তার কাছে বড় সাফল্য।
পঞ্চাশোর্ধ্ব এই নারী বলেন, “আমার সামর্থ্য সীমিত। কিন্তু সন্তানদের হাসিটাই বড় কথা। গত দুই বছর যুদ্ধ আমাদের মধ্যে যে শোক আর বিষণ্ণতা এনে দিয়েছে, আমি চাই এই সাজসজ্জা দিয়ে অন্তত কিছুটা তা ভুলে থাকতে।”
৫২ বছর বয়সী মাইসুন সবার কাছে ‘উম্মে মোহাম্মদ’ নামে পরিচিত। তার বড় ছেলে ১৫ বছরের, ছোটটি ৯ বছরের।
তিনি বলেন, “ওরাই আমার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। প্রতিদিন যখন ওরা নিরাপদে থাকে, তখন আমি কৃতজ্ঞতা অনুভব করি।”
তার কণ্ঠে ছিল গর্ব, কিন্তু লুকিয়ে ছিল ভয়ও—যুদ্ধের সময় সন্তানদের হারানোর যে আতঙ্ক তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করেছে, সেটিরই প্রতিধ্বনি।
এবারের রমজান গাজার মানুষের কাছে কিছুটা ভিন্ন, কারণ বর্তমানে একটি তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি বা যুদ্ধবিরতি চলছে। গত দুই বছরের ভয়াবহ সময়ের তুলনায় এখন পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা।
ইসরাইলের হামলায় ৭০ সহস্রাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর যুদ্ধ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। যদিও ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, তবুও মাঝেমধ্যে গোলাবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
মাইসুন বলেন, “সবাই জানে যুদ্ধ পুরোপুরি থামেনি। তবে আগের মতো ভয়াবহতা নেই।”
রমজানের প্রথম দিনে আজানের আগে রুটি তৈরি এবং খেজুর ও পানি বিতরণের কাজে সাহায্য করেন মাইসুন। শিবিরের প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশ নিয়ে তিনি যেন নিজের ব্যথাকে শক্তিতে রূপ দেন।
তিনি বলেন, “উদ্বাস্তু অবস্থায় এটি আমাদের কাটানো তৃতীয় রমজান। আমরা ঘরবাড়ি, পরিবার, প্রিয়জন—অনেক কিছু হারিয়েছি। কিন্তু এই শিবিরে আমাদের প্রতিবেশী ও বন্ধুরা আছে, যারা একই কষ্টের অংশীদার। আমরা সবাই একে অপরকে সাহায্য করতে চাই।”
যুদ্ধের শুরুতে দক্ষিণ-পূর্ব গাজায় নিজের বাড়ি হারান মাইসুন। স্বামী হাসুনা এবং সন্তানদের নিয়ে বিভিন্ন শিবিরে ঘোরার পর অবশেষে বুরেজ শিবিরে আশ্রয় নেন।
তিনি এই অবস্থাকে “শোচনীয়” বলে বর্ণনা করেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, “আমরা শূন্য থেকে জীবন আর আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছি। রমজান আর ঈদ আসে-যায়, কিন্তু আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না।”
ধ্বংসস্তূপের মাঝে ছোট্ট ফানুস, ছেঁড়া তাঁবুর ভেতরে রঙিন আঁকিবুকি—এই সামান্য আয়োজনই এখন গাজার অনেক পরিবারের কাছে আশার আলো।
রমজান তাদের জন্য শুধু ইবাদতের মাস নয়; এটি টিকে থাকার শক্তি, ধৈর্য আর বিশ্বাসের পুনর্নবীকরণ।

