সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা বুধবার হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেছে। বৈঠক ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত বাস্তব রূপ পায়নি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আলোচনা ‘কঠিন’ ছিল বলে মন্তব্য করেছেন এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণের অভিযোগ তুলেছেন। খবর রয়টার্সের।
জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, রাশিয়া এমন কৌশল নিচ্ছে যাতে শান্তিচুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। তার দাবি, আলোচনা ইতোমধ্যে শেষ ধাপে পৌঁছাতে পারত, কিন্তু মস্কোর অবস্থানের কারণে তা সম্ভব হয়নি।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আরআইএ জানায়, জেলেনস্কির মন্তব্যের কিছুক্ষণ পরই বৈঠক শেষ হয়ে যায়। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক আলোচনা প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল।
তবে রাশিয়ার একটি সূত্র বলছে, আলোচনা ছিল ‘খুব উত্তেজনাপূর্ণ’ এবং দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় বিভিন্ন ফরম্যাটে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত কথা হয়েছে। রাশিয়ার প্রধান আলোচক ভ্লাদিমির মেদিনস্কি জানিয়েছেন, আলোচনা কঠিন হলেও তা ‘ব্যবসায়িক ও গঠনমূলক’ ছিল। তিনি বলেছেন, শিগগির নতুন দফার বৈঠক হবে, যদিও নির্দিষ্ট তারিখ জানাননি।
ইউক্রেনীয় প্রতিনিধি দলের প্রধান রুস্তেম উমেরভ বলেন, বৈঠকে সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের কাঠামো ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ দাবি করেছেন, এই আলোচনায় যুদ্ধ শেষ করার পথে ‘অর্থপূর্ণ অগ্রগতি’ হয়েছে এবং দুই পক্ষই সংলাপ চালিয়ে যেতে রাজি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেন, আলোচনায় সফল হতে হলে ইউক্রেনকেই দ্রুত সমঝোতায় আসতে হবে। এই বক্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জেলেনস্কি।
তিনি বলেন, শুধু ইউক্রেনকে ছাড় দিতে বলা ন্যায্য নয়। বিশেষ করে পূর্ব দোনবাস অঞ্চলে রাশিয়া পুরোপুরি দখল করতে পারেনি এমন ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে বলা হলে তা ইউক্রেনীয় জনগণ গণভোটে প্রত্যাখ্যান করবে।
রাশিয়া এখনও পূর্ব ইউক্রেনের কিছু অঞ্চল থেকে ইউক্রেনীয় সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে। কিয়েভ এই দাবি স্পষ্টভাবে নাকচ করেছে।
শান্তি আলোচনার মাঝেই নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছেন। অভিযোগ—ইউক্রেনীয়দের হত্যায় সহায়তা।
এদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নিকোলাই পাত্রুশেভ সতর্ক করেছেন, পশ্চিমা দেশগুলো যদি নিষেধাজ্ঞার অংশ হিসেবে রাশিয়ার তেলবাহী জাহাজ জব্দ করে, তবে তা ঠেকাতে রাশিয়ার নৌবাহিনী মোতায়েন হতে পারে।
জেনেভার বৈঠক আপাতত কোনো দৃশ্যমান সমাধান না এনে শেষ হয়েছে। তবে উভয় পক্ষই আলোচনার দরজা খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে।
একদিকে ইউক্রেন বলছে রাশিয়া সময়ক্ষেপণ করছে, অন্যদিকে রাশিয়া দাবি করছে আলোচনা গঠনমূলক ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আশাবাদের সুর শোনা গেলেও ময়দানের বাস্তবতা এখনো জটিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনা পর্ব হয়তো দীর্ঘ প্রক্রিয়ার একটি ধাপ মাত্র। চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতে হলে ভূখণ্ড, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ—এই তিনটি ইস্যুতেই বড় ধরনের সমঝোতা প্রয়োজন হবে।

