যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত শুল্কনীতিতে বড় ধাক্কা এসেছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত থেকে। গতকাল এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প একের পর এক দেশের ওপর যে শুল্ক আরোপ করে আসছেন, তা তার সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই ট্রাম্প কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুল্ককে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে কার্যত সেই কৌশলে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলো।
রায় ঘোষণার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি একে “অপমানজনক” বলে অভিহিত করেছেন।
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ট্রাম্প তার নতুন শুল্কনীতি ঘোষণা করেন। সে অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে—এমন সব দেশের ওপর ১০ শতাংশ ‘বেইসলাইন শুল্ক’ আরোপ করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে ‘পাল্টাপাল্টি শুল্ক’ বা ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়।
চীন, ভারত, কানাডা, মেক্সিকো, ব্রাজিলসহ একাধিক দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের সময়ে এই রেসিপ্রোকাল ট্যারিফকে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্ট এর আগে এত বিস্তৃতভাবে জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন—এমন নজির নেই।
২ এপ্রিলকে ট্রাম্প ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তার দাবি ছিল, এই নীতির মাধ্যমে দেশ অর্থনৈতিক মুক্তি পাবে।
ট্রাম্প যে আইন ব্যবহার করে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করছিলেন, সেটি হলো ১৯৭৭ সালে প্রণীত ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনোমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ)।
এই আইনে বলা আছে, শুল্ক আরোপ ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান ক্ষমতা কংগ্রেসের। প্রেসিডেন্ট জরুরি পরিস্থিতিতে কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন, তবে তা কংগ্রেসের নির্দেশনার আওতায় এবং নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে।
সুপ্রিম কোর্ট তাদের রায়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন, আইইইপিএ প্রেসিডেন্টকে নিজের ইচ্ছামতো শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না।
শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টে মোট ৯ জন বিচারপতি শুনানিতে অংশ নেন। এর মধ্যে ৬ জন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রায় দেন। তারা বলেন, আইইইপিএ–র ব্যাখ্যা করে প্রেসিডেন্ট যে শুল্ক আরোপ করছেন, তা আইনের উদ্দেশ্য ও সীমা অতিক্রম করেছে।
এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে ফেডারেল আপিল আদালতও ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিধিবহির্ভূত ব্যবহার বলে উল্লেখ করেছিল। সুপ্রিম কোর্ট সেই নিম্ন আদালতের রায়ই বহাল রাখল।
সুপ্রিম কোর্ট যখন রায় ঘোষণা করে, তখন ট্রাম্প অঙ্গরাজ্যগুলোর গভর্নরদের সঙ্গে বৈঠকে ছিলেন। বৈঠক শেষে তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন,
“সুপ্রিম কোর্টের এই রায় অপমানজনক। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অধিকার আমার আছে।”
তার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার সীমা নিয়ে টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে।
এই রায়ের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। কংগ্রেসের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, আর প্রেসিডেন্টের একক সিদ্ধান্তে শুল্ক আরোপের পথ কার্যত সংকুচিত হলো।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু বাণিজ্য নীতির প্রশ্ন নয়—বরং যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার ভারসাম্য ও সাংবিধানিক সীমারেখা নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

