দেশজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার সময়েই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিল ইরান। তেহরান জানিয়েছে, তারা তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশুদ্ধতার মাত্রা কমাতে প্রস্তুত। যদিও ৩০০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে রপ্তানির প্রস্তাবে তারা রাজি নয়, তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) তত্ত্বাবধানে মজুত ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধতা কমিয়ে ফেলার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
এই প্রস্তাবটি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ওয়াশিংটনের কাছে উপস্থাপন করা হতে পারে বলে ইরানি সূত্র জানিয়েছে।
বর্তমানে ইরানের হাতে রয়েছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম—যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার কাছাকাছি বলে বিবেচিত। এখন তেহরান সেই মাত্রা কমিয়ে ২০ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি কৌশলগত বার্তা—একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ কিছুটা লাঘবের চেষ্টা, অন্যদিকে নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ত্যাগ না করার ইঙ্গিত।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল নৌ-বাহিনী মোতায়েন করেছেন এবং ইরানে সামরিক হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। ঠিক এই সময়েই ইরানের পক্ষ থেকে এই নতুন প্রস্তাব আসতে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে কূটনীতি ও সামরিক পদক্ষেপ—দুই সম্ভাবনাই সমানভাবে আলোচনায় রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করার কোনো দাবি তোলেনি। বরং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন দুটি বিষয়ের ওপর—
-
সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কত হবে
-
কতগুলো সেন্ট্রিফিউজ ব্যবহারের অনুমতি থাকবে
অতীতে ইরানের এই মজুত রাশিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছিল। কিন্তু ইরানি কূটনীতিকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের পারমাণবিক উপাদান দেশের বাইরে যাবে না।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে টানাপোড়েনের মধ্যেই ইরানের অভ্যন্তরে অস্থিরতা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) মাশহাদ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং তেহরানের অন্তত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়।
শরীফ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরাসরি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে রাজপথে নেমে আসেন। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
বিক্ষোভের আশঙ্কায় আগে বন্ধ থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্প্রতি খুলেছিল। কিন্তু নতুন করে আন্দোলন শুরু হওয়ায় কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে দিয়েছে—অস্থিরতা না থামলে আবারও ক্লাস অনলাইনে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পড়ছে। লন্ডনে প্রায় ১,৫০০ মানুষ ইরানি দূতাবাস বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন।
অন্যদিকে, জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে ইরানের প্রতিনিধি আফসানেহ নাদিপুর দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাওয়ায় সেখানে প্রতিবাদ সমাবেশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইরানের আইনজীবী রেজা নাসরি সতর্ক করে বলেছেন, যদি কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়, তাহলে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো ভিন্ন বার্তা পাবে। তাদের ধারণা হতে পারে—যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলকে ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করা।
এই মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এখন সব নজর ওয়াশিংটনের দিকে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের এই নতুন প্রস্তাবকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তার ওপরই নির্ভর করছে পরবর্তী পদক্ষেপ।
একদিকে সামরিক প্রস্তুতি, অন্যদিকে কূটনৈতিক প্রস্তাব—এই দ্বৈত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আবারও এক সংকটময় মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

