যুক্তরাষ্ট্রের ঘন ঘন বদলানো শুল্কনীতির কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়ন থেকে পিছিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট দেশের পণ্যের ওপর আরও বেশি শুল্ক বসানো হবে—এমন হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
বাড়তি শুল্কের চাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২০টি দেশ বাণিজ্যচুক্তি করেছে। এ তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। বাংলাদেশ ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রায় দিলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও রপ্তানিকারকদের একটি অংশ মনে করেছিলেন, চুক্তিটি হয়তো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু ট্রাম্পের নতুন ঘোষণায় সেই আশা অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষর করা এবং প্রক্রিয়াধীন দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপান, সুইজারল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, লিচেনস্টাইন ও উত্তর মেসিডোনিয়া।
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭৭ সালের আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন (আইইইপিএ)-এর আওতায় ট্রাম্প আরোপিত পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করে। এই রায়ের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত ওই আইনের আওতায় করা বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়নের পরবর্তী পদক্ষেপ স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান ট্রাম্প। নিজের মালিকানাধীন ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, যারা সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তকে সামনে এনে সুবিধা নিতে চাইবে, বিশেষ করে যেসব দেশ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে শোষণ করেছে, তাদের ওপর আরও বেশি শুল্ক আরোপ করা হবে। এই শুল্ক আগে নির্ধারিত হারের চেয়েও বেশি হবে। পোস্টের শেষে তিনি সতর্ক করে লেখেন—‘ক্রেতা সাবধান’।
গত বছরের ১ এপ্রিল বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর যুক্তি দেখিয়ে ট্রাম্প বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এর নাম দেওয়া হয় পাল্টা শুল্ক। উচ্চ শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক দেশ তখন সমঝোতার পথে হাঁটে। সে সময় পৃথক বাণিজ্যচুক্তির শর্ত দেন ট্রাম্প।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি স্বাক্ষর করে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের বাণিজ্য সুবিধা দেওয়া হয়। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য অঙ্কের আমদানির প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। আরও কিছু অঙ্গীকার রয়েছে, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুসরণের বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী নেতারা এই চুক্তিকে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বলে মত দিয়েছেন। তারা চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা এবং দেশের স্বার্থ রক্ষা করে সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছেন।
পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এনামুল হক খান বাবলু বলেন, পারস্পরিক শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করেছে। ফলে এটি আর ফিরে আসবে না, যা বড় স্বস্তির খবর। নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিষয়ে তিনি বলেন, এটিও বড় সমস্যা নয়। কারণ এই হার সব দেশের জন্যই প্রযোজ্য। তার মতে, এটিও শেষ পর্যন্ত টিকবে না।
তিনি আরও বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় একই শুল্ক হার থাকলে বাংলাদেশই লাভবান হবে। কারণ তৈরি পোশাক খাতে দেশের সক্ষমতা বেশি। গত চার দশকে এ শিল্প অনেক পরিণত হয়েছে। অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক বেশি নিয়ম মেনে উৎপাদন করে।
আজ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক:
নতুন সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরকে ইতোমধ্যে বাণিজ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি ও সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন। এ বিষয়ে আজ বুধবার মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানান, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ নিজ থেকে চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেবে না। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে আনুষ্ঠানিকভাবে জানালে বাংলাদেশ তখন আইনি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করবে। এরপর সরকার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
চুক্তি বাস্তবায়ন না করলে বাড়তি শুল্ক আরোপের ট্রাম্পের হুমকি সম্পর্কে তিনি বলেন, বিষয়টি গণমাধ্যম থেকে জানা গেছে। এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, শুরু থেকেই আলোচনায় থাকা দেশগুলো তুলনামূলক কম শুল্কের আওতায় থাকবে।
নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর:
এদিকে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আগের শুল্ক বাতিল হলেও ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারার ক্ষমতায় সাময়িকভাবে ১৫০ দিনের জন্য ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্বাহী আদেশ কার্যকর করেছে সে দেশের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশন। যদিও পরে ট্রাম্প মৌখিকভাবে এই হার ১৫ শতাংশ করার কথা বলেন।
অতিরিক্ত ৫ শতাংশ শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা এলেও এখনো নতুন কোনো সংশোধিত আদেশ জারি হয়নি। ফলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বর্তমানে স্বাভাবিক শুল্কের সঙ্গে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্কই আদায় করছে। এটিও বাড়তি চাপ তৈরি করছে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন, ১৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করার প্রস্তুতি চলছে।

