বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে একজন পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেওয়ায় দেশে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন বিএনপি সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই ব্যতিক্রমী বলছেন। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যবসায়ী গভর্নর।
বিশ্বপরিসরে এমন নজির খুব কম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে ব্যবসায়ীদের দেখা যায় না বললেই চলে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ–এর ইতিহাসেও ব্যবসায়ী চেয়ারম্যান ছিলেন মাত্র তিনজন। তাঁরা হলেন ইউজেন আই মেয়ার, টমাস বি ম্যাককেব ও জি উইলিয়াম মিলার। তাঁদের মধ্যে মিলার ১৯৭৯ সালে সর্বশেষ চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত হন। এরপর থেকে মূলত অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞদেরই এই পদে বসানো হচ্ছে। তথ্যগুলো ফেডারেল রিজার্ভের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া।
সাধারণত বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ ব্যাংকার বা পেশাদার অর্থনীতিবিদরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হন। ইউরোপেও বিশেষজ্ঞদের প্রাধান্য দেখা যায়। ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ আমলাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বর্তমানে পেশাদার অর্থনীতিবিদ বা আর্থিক খাতে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই এগিয়ে। অনেক সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব পর্ষদ থেকেও চেয়ারম্যান বা গভর্নর বেছে নেওয়া হয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে একজন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেওয়া বিস্ময় তৈরি করেছে।
ফেডের ব্যবসায়ী চেয়ারম্যানদের ইতিহাস:
যুক্তরাষ্ট্র পুঁজিবাদী অর্থনীতির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সেই দেশেই ফেড গঠিত হয়েছিল ব্যক্তিগত উদ্যোগের ভিত্তিতে। তবু ব্যবসায়ী চেয়ারম্যানের সংখ্যা মাত্র তিনজন।
ইউজেন আই মেয়ার:
১৮৭৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে জন্ম। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও আইনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯০১ সালে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ইউজিন মেয়ার জুনিয়র অ্যান্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। পরে এটি বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ে যায়। রেলপথ, তেল, তামা ও অটোমোবাইল শিল্পেও তাদের আগ্রহ ছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সরকারি দায়িত্বে আসেন। ১৯১৮ সালে প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন তাঁকে ওয়ার ফাইনান্স করপোরেশনের পরিচালক করেন। ১৯২৭ সালে প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজ ফেডারেল ফার্ম লোন বোর্ডের সদস্য নিয়োগ দেন। ১৯২৯ সালে পদত্যাগ করেন। ১৯৩০ সালে ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ডের গভর্নর হন।
তাঁর দায়িত্বকালে যুক্তরাষ্ট্র মহামন্দার ধাক্কায় বিপর্যস্ত। সাধারণত ফেড চেয়ারম্যানরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোর দেন। কিন্তু মেয়ার অর্থনীতিকে সচল রাখতে ব্যবসায়িক উদ্যোগ বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নেন।
টমাস বি ম্যাককেব:
১৮৯৩ সালে মেরিল্যান্ডে জন্ম। ১৯১৫ সালে সুয়ার্থমোর কলেজ থেকে স্নাতক। কর্মজীবন শুরু স্কট পেপার কোম্পানিতে বিক্রয়কর্মী হিসেবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সহকারী বিক্রয় ব্যবস্থাপক হন। পরের বছর পরিচালক। পরে প্রেসিডেন্ট ও সিইও। তাঁর নেতৃত্বে ছোট কারখানা থেকে প্রতিষ্ঠানটি ৪০ হাজার কর্মীর বহুজাতিক কোম্পানিতে পরিণত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফেডের চেয়ারম্যান হন। তাঁর অবস্থান ছিল পরিষ্কার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ সরকারের ঋণের খরচ কম রাখা নয়। বরং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এই অবস্থান থেকে ট্রেজারির সঙ্গে টানাপোড়েন শুরু হয়। ১৯৫১ সালের ট্রেজারি–ফেড সমঝোতায় সুদের হার নির্ধারণে ফেড আরও স্বাধীনতা পায়। চূড়ান্ত সমঝোতার আগেই ম্যাককেব সরে দাঁড়ান। তবে নীতিগত স্বাধীনতার ভিত্তি গড়তে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
জি উইলিয়াম মিলার:
১৯২৫ সালে ওকলাহোমায় জন্ম। ইউএস কোস্টগার্ড একাডেমি থেকে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক। পরে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলে স্কুল অব ল থেকে আইনে ডিগ্রি নেন।
আইন পেশায় কাজের পর টেক্সট্রন ইনকরপোরেটেডে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট। ১৯৬০ সালে প্রেসিডেন্ট। ১৯৬৮ সালে সিইও। ১৯৭৪ সালে চেয়ারম্যান ও সিইও হন। ব্যবসায়িক সাফল্যের কারণে তিনি দক্ষ নেতা হিসেবে পরিচিতি পান।
ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর নীতি ছিল সম্প্রসারণমূলক। পূর্বসূরিদের তুলনায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কম জোর দেন। প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করাকে অগ্রাধিকার দেন। তাঁর মতে মূল্যস্ফীতির সব কারণ ফেডের নিয়ন্ত্রণে নয়।
এই নীতির প্রেক্ষাপটে ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। মিলারের পর চেয়ারম্যান হন পল ভোলকার। তিনি মূল্যস্ফীতি কমাতে নীতি সুদহার আক্রমণাত্মকভাবে বাড়ান। পরে মূল্যস্ফীতি কমে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। এই কঠোর পদক্ষেপ ‘ভোলকার শক’ নামে পরিচিত।
কেন বদলে গেল ধারা:
১৯৭৯ সালের পর আর কোনো পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়ী ফেডের চেয়ারম্যান হননি। ফেডের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, নীতি ও বাজারের মধ্যে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখাই এখন অগ্রাধিকার। গত চার দশকে অর্থনীতি বা ব্যাংকিং–বিশেষজ্ঞরাই চেয়ারম্যান হয়েছেন। পদটির ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে প্রেসিডেন্ট বা কংগ্রেসের স্বল্পমেয়াদি চাপ নীতিতে প্রভাব না ফেলে।
চেয়ারম্যান নির্বাচনে মূল বিবেচনা থাকে নীতিস্বাধীনতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধির ভারসাম্য। মুদ্রানীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো সম্পর্কে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদেরই বেছে নেওয়া হয়, যাতে সুদের হার, মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার মধ্যে সমন্বয় রাখা যায়।
বাংলাদেশে ব্যবসায়ী গভর্নর নিয়োগের আলোচনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিজ্ঞতা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
