আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা এবার নতুন ও ভয়াবহ মাত্রা পেয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, তালেবান শাসিত আফগানিস্তানের সঙ্গে তাদের ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে এবং দুই দেশ এখন কার্যত একটি ‘উন্মুক্ত যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েছে।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ভোর থেকে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান থেকে শক্তিশালী বোমা হামলা চালানো হয়। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে এই হামলা শুরু হয় বলে জানা গেছে।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানান, কাবুল ছাড়াও কান্দাহার এবং পাকতিয়া প্রদেশে তালেবানের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। বিশেষ করে ব্রিগেড সদর দপ্তর ও গোলাবারুদের ডিপো ছিল প্রধান টার্গেট।
হামলার সময় আফগান বাহিনীর পক্ষ থেকে বিমান বিধ্বংসী কামান দিয়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। রাজধানীর আকাশে বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
এই হামলার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) কড়া ভাষায় বার্তা দেন। তিনি লেখেন, “আমাদের ধৈর্যের পেয়ালা পূর্ণ হয়ে গেছে। এখন আমাদের আর তোমাদের মধ্যে খোলাখুলি যুদ্ধ শুরু হলো।”
তার এই বক্তব্য দুই দেশের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
বর্তমান উত্তেজনার সূত্রপাত হয় গত রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি), যখন আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিমান হামলার অভিযোগ ওঠে। তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ জানান, সেই হামলার প্রতিশোধ নিতেই শুক্রবার ভোরে আফগান বাহিনী ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তানি সামরিক অবস্থানে বড় ধরনের আক্রমণ চালায়।
তালেবানের দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানে ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছেন এবং ১৯টি সামরিক পোস্ট ও দুটি ঘাঁটি দখল করা হয়েছে। তবে পাকিস্তান এসব দাবি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে।
দুই দেশ থেকেই হতাহতের সংখ্যা নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি দাবি করেছেন, পাকিস্তানের হামলায় ১৩৩ আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং ২০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। পাশাপাশি ৮০০টিরও বেশি ট্যাংক, কামান ও সশস্ত্র যান ধ্বংসের কথাও জানিয়েছে ইসলামাবাদ।
অন্যদিকে, তালেবান সরকারের দাবি, তাদের মাত্র ৮ যোদ্ধা নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষে পাকিস্তানের দুই সামরিক সদস্য নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
এই ভিন্নমুখী তথ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ২৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ডুরান্ড লাইন’। আফগানিস্তান কখনোই এই সীমান্তকে আনুষ্ঠানিক ও বৈধ সীমারেখা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে অন্তত ৭৫ বার ছোট-বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সীমান্তে উত্তেজনা তাই নতুন কিছু নয়, তবে এবারের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিস্ফোরক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, তাদের দেশে হামলা চালানো সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’ (টিটিপি) আফগান ভূখণ্ডে আশ্রয় পাচ্ছে। তবে তালেবান বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এই ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছে, যা সময়ের সঙ্গে আরও প্রকট হয়েছে।
সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আফগানিস্তান ঐক্যবদ্ধভাবে তার মাতৃভূমি রক্ষা করবে।
আন্তর্জাতিক মহলও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। ইরান ও রাশিয়া আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দিয়েছে।
ভারত এই বিমান হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা আড়াল করার প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করেছে।
উভয় পক্ষই ভারি অস্ত্রশস্ত্র ও গোলন্দাজ বাহিনী নিয়ে সীমান্তে অবস্থান নিয়েছে। ফলে পরিস্থিতি যে কোনো সময় আরও বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা—সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক এখন এক অগ্নিপরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। পরিস্থিতি কূটনৈতিক আলোচনার দিকে গড়ায়, নাকি আরও বড় সামরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়—সেটাই এখন দেখার বিষয়।

