পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা সম্প্রতি সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। ডুরান্ড লাইনের বিভিন্ন এলাকায় ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও সাঁজোয়া যান নিয়ে দুই দেশের বাহিনী মুখোমুখি অবস্থান নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—সামরিক শক্তির বিচারে কার অবস্থান কতটা দৃঢ়?
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মহম্মদ আসিফ ইতোমধ্যে এই অভিযানকে তালেবানের বিরুদ্ধে ‘পূর্ণ যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রীও দাবি করেছেন, তাদের বাহিনী তালেবানকে গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম। এমন ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—দুই দেশের সামরিক সক্ষমতার বাস্তব চিত্র কী?
আইআইএসএসের তথ্য যা বলছে
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ (আইআইএসএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক অবকাঠামোর দিক থেকে পাকিস্তান আফগানিস্তানের তুলনায় অনেক এগিয়ে।
পাকিস্তান তাদের প্রধান প্রতিরক্ষা অংশীদার চীনের কাছ থেকে নিয়মিতভাবে আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করছে। শুধু স্থলবাহিনী নয়, বিমান ও নৌবাহিনীও ধারাবাহিকভাবে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশটি পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিপুল বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে, যা তাদের সামরিক শক্তিকে আঞ্চলিক পর্যায়ে আরও প্রভাবশালী করেছে।
অন্যদিকে তালেবান শাসিত আফগানিস্তানের সামরিক সক্ষমতা নানা সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের সময় তারা যে বিপুল পরিমাণ বিদেশি সরঞ্জাম জব্দ করেছিল, তার অনেকগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনায় কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকায় নতুন করে অস্ত্র সংগ্রহ বা আধুনিকায়ন করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
সৈন্যসংখ্যায় বিশাল ব্যবধান
দুই দেশের সক্রিয় সেনা সদস্যের সংখ্যা তুলনা করলে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে বর্তমানে ৬ লাখ ৬০ হাজার সক্রিয় সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীতে ৫ লাখ ৬০ হাজার, বিমান বাহিনীতে ৭০ হাজার এবং নৌবাহিনীতে ৩০ হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে আফগান তালেবান বাহিনীর সক্রিয় সদস্য সংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৭২ হাজার। তারা ভবিষ্যতে এই সংখ্যা ২ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে বলে জানা গেছে। সংখ্যার দিক থেকেই বোঝা যায়, জনবল ব্যবধানে পাকিস্তান অনেক এগিয়ে।
স্থলযুদ্ধে কার শক্তি কতটা?
স্থলযুদ্ধের সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও পাকিস্তান সুসংগঠিত ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। দেশটির হাতে ৬ হাজারেরও বেশি সাঁজোয়া যুদ্ধযান রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ৪ হাজার ৬০০-র বেশি কামান।
অন্যদিকে তালেবানের কাছে কিছু সাঁজোয়া যান, সোভিয়েত আমলের ট্যাঙ্ক এবং সাঁজোয়া পার্সোনেল ক্যারিয়ার থাকলেও সেগুলোর সঠিক সংখ্যা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তাদের কামানের সংখ্যাও স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। ফলে স্থলযুদ্ধে টেকসই লড়াইয়ের ক্ষেত্রে আফগান বাহিনী কতটা সক্ষম—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
আকাশপথে বিশাল ব্যবধান
সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি চোখে পড়ে আকাশপথে। পাকিস্তানের বিমানবহরে ৪৬৫টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান রয়েছে। এর সঙ্গে ২৬০টিরও বেশি হেলিকপ্টার যুক্ত হয়েছে। আকাশপথে নজরদারি, আক্রমণ ও দ্রুত মোতায়েন—সবক্ষেত্রেই পাকিস্তান শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
বিপরীতে আফগানিস্তানের কার্যকর কোনো পূর্ণাঙ্গ বিমানবাহিনী নেই। তাদের হাতে মাত্র ৬টি বিমান রয়েছে, যার কয়েকটি সোভিয়েত আমলের। এছাড়া ২৩টি হেলিকপ্টার থাকলেও সেগুলোর কতটি বাস্তবে উড্ডয়নযোগ্য—তা নিশ্চিত নয়। ফলে আকাশ নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তানের স্পষ্ট আধিপত্য রয়েছে।
পারমাণবিক সক্ষমতা
পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। দেশটির কাছে ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে বলে আন্তর্জাতিকভাবে ধারণা করা হয়। এই সক্ষমতা কেবল আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে আফগানিস্তানের এমন কোনো পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার নেই। ফলে কৌশলগত প্রতিরোধ সক্ষমতার দিক থেকেও দুই দেশের মধ্যে বিশাল ফারাক বিদ্যমান।
সামগ্রিক চিত্র
সব দিক বিবেচনায় দেখা যায়, সামরিক অবকাঠামো, জনবল, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, বিমান শক্তি এবং পারমাণবিক সক্ষমতার বিচারে পাকিস্তান অনেক বেশি সুসংহত ও শক্তিশালী। আফগানিস্তানের তুলনায় তাদের প্রতিরক্ষা কাঠামো অনেক বেশি সংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু অস্ত্রের পরিমাণই যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করে না। ভৌগোলিক বাস্তবতা, কৌশল, স্থানীয় সমর্থন ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ডুরান্ড লাইনে চলমান উত্তেজনা যদি আরও বিস্তৃত সংঘর্ষে রূপ নেয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু দুই দেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—পুরো অঞ্চলেই অস্থিরতা বাড়তে পারে। তাই সামরিক শক্তির তুলনা যতই একপেশে হোক না কেন, কূটনৈতিক সমাধানই যে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর পথ—তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে খুব একটা দ্বিমত নেই।

