যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা যে সরাসরি যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, সেই আশঙ্কা আগেই করেছিল ইরান। তাই যুদ্ধের প্রস্তুতির পাশাপাশি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার দিকেও গুরুত্ব দিয়েছে দেশটি।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে খামেনি সরকার কী ধরনের কৌশল নিতে পারে, তা উঠে এসেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে।
এসব বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য উত্তরসূরি নির্ধারণ, নেতৃত্ব কাঠামো গঠন, সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন—সবকিছু নিয়েই পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য সংকটে ইরানের সামনে কী বিকল্প থাকতে পারে, সে বিষয়েও মতামত দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন ৮৬ বছর বয়সী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। এই নিয়ন্ত্রণ তিনি সহজে ছেড়ে দেবেন বা ব্যবস্থার অবসান ঘটতে দেবেন—এমন কোনো ইঙ্গিত নেই।
রাষ্ট্রকাঠামো:
নিউইয়র্ক টাইমস ইরানি কর্মকর্তাদের বরাতে জানায়, ইসলামি শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো নতুনভাবে সাজানো হয়েছে।
সামরিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পদে চার স্তরের উত্তরাধিকার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
শীর্ষ নেতৃত্বকে সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টা থেকে রক্ষা করা এবং পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কৌশল নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি ও তার ঘনিষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগীদের।
যোগ্য উত্তরসূরি নির্ধারণে শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিজ নিজ বিকল্প তালিকাও প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে বা শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হলে যাতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, সে ক্ষমতাও একটি ঘনিষ্ঠ বলয়ের হাতে রাখা হয়েছে।
উত্তরসূরি:
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ধারণা অনুযায়ী, খামেনি মারা গেলে তার উত্তরসূরি হতে পারেন দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কোনো প্রভাবশালী কর্মকর্তা।
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিচ বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, খামেনি নিহত হলে ইরানের বিকল্প পরিকল্পনা রয়েছে। একক উত্তরসূরি নির্ধারণের বদলে একটি ছোট কমিটির হাতে ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে।
তার মতে, গত বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে শীর্ষ ২০ নেতা নিহত হওয়ার পর নেতৃত্ব রক্ষায় আরও বেশি গুরুত্ব দেন খামেনি। গত আট মাসে আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়েছে।
নিজের উত্তরসূরি হিসেবে তিনজনের নামও নির্ধারণ করে রেখেছেন খামেনি। তবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষক ভ্যালি নাসর নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, খামেনি রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে যুদ্ধ ও উত্তরাধিকার—এই দুই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করেছেন।
নতুন নেতৃত্ব:
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইতোমধ্যে নেতৃত্বের বড় একটি অংশ তার বিশ্বস্ত সহযোগী ও শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানির হাতে তুলে দিয়েছেন।
৬৭ বছর বয়সী লারিজানি ইরানের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তিনি সাবেক বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার এবং বর্তমানে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান।
ইরানের ছয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বিপ্লবী গার্ড সদস্য এবং সাবেক কূটনীতিকদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর ভূমিকা পালন করেন লারিজানি।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দায়িত্বও কার্যত লারিজানির হাতেই রয়েছে। যুদ্ধকালীন রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনাও তার তত্ত্বাবধানে করা হয়েছে।
ইরানের ডেলসি:
ভেনেজুয়েলার উদাহরণ সামনে রেখে ‘ইরানের ডেলসি’ কে হতে পারেন, তা নিয়েও ঘনিষ্ঠ মহলে আলোচনা করেছেন খামেনি।
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হলে সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় সবার আগে রয়েছেন লারিজানি। এরপর রয়েছেন পার্লামেন্ট স্পিকার ও সাবেক গার্ড কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আলি ভাইজ বলেন, বিকল্প পরিকল্পনা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের ফল অনিশ্চিত। খামেনি এখন আগের চেয়ে কম দৃশ্যমান হলেও ঝুঁকির মাত্রা বেশি। তবু তিনি এখনো পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইনস্টিটিউটের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মোহাম্মদ ইসলামি তুরস্কের গণমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডকে বলেন, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র টিকে থাকবে। কোন অবস্থায় থাকবে তা নিশ্চিত নয়। তবে তারা পিছু হটবে না। প্রয়োজন হলে পুরো অঞ্চল জ্বালিয়ে দেওয়ার পথেও যেতে পারে।

