ইরানজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই সংঘাত কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং বিশ্ববাজারের স্থিতিশীলতার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা দ্রুত বেড়েছে। জ্বালানি খাতে তার প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট। তেলের দাম ওঠানামা করছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে আমদানি-নির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কায় বিভিন্ন খাতে চাপ তৈরি হচ্ছে।
স্বর্ণের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময় বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে দামের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে বিভিন্ন দেশের মুদ্রাবাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। ডলারের বিপরীতে একাধিক মুদ্রার মান ওঠানামা করছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত দেশগুলো বিশেষভাবে উদ্বেগে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রবাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করছেন, সংঘাত যদি বিস্তৃত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
জ্বালানি তেলের দামে বড় লাফ:
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সংবেদনশীল সূচক ধরা হয় জ্বালানি তেলকে। কারণ এই অঞ্চল বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের কেন্দ্রবিন্দু। ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ। পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’র পাশেই এর অবস্থান। এই প্রণালী দিয়েই বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে সামান্য অস্থিরতাও দ্রুত বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকস–এর উদীয়মান বাজার বিষয়ক অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম জ্যাকসন সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এতে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি আরও ০.৬ থেকে ০.৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে ‘হরমুজ প্রণালী’তে জাহাজ চলাচল স্থগিত হওয়ার খবরে বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কায় জ্বালানি বাজারে দাম ওঠানামা করছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
বিনিয়োগে ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা:
যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘনীভূত হলে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে আসেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শেয়ারবাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে স্বর্ণ ও সুইস ফ্রাঙ্কের মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন অনেকে। ২০২৬ সালে স্বর্ণের দাম ইতিমধ্যে রেকর্ড ২২ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের চাহিদাও বাড়ছে, যা বৈশ্বিক উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে, ক্রিপ্টো বাজারে চাপ স্পষ্ট। বিটকয়েনের দাম শনিবার ২ শতাংশ কমেছে। গত দুই মাসে এর মূল্য এক-চতুর্থাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে উচ্চ ঝুঁকির সম্পদে বিনিয়োগ কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।
মুদ্রাবাজারে চাপ:
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মার্কিন ডলার অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় আরও শক্তিশালী হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এখন নিট জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ। ফলে তেলের দাম বাড়লে তারা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। এর প্রভাব মুদ্রাবাজারে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের পাল্টা হামলার শঙ্কায় ইসরায়েলের মুদ্রা শেকেলের ওপর চাপ বাড়তে পারে। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে শেকেলের মান কমলেও দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়েছে। তবে জেপি মরগান চেজ এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এবার সংঘাত দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
আজ যখন সৌদি আরব ও কাতার–এর শেয়ারবাজার খুলবে, তখন বিনিয়োগকারীদের মনোভাব পরিষ্কার হবে। নিওভিশন ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী রায়ান লেমান্ডের মতে, সংঘাতের মাত্রার ওপর নির্ভর করে উপসাগরীয় বাজার ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। ইতিমধ্যে সৌদি আরবের প্রধান সূচক টানা দুই সপ্তাহ ধরে নিম্নমুখী।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট বাতিল শুরু করেছে। এতে এয়ারলাইন কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামে চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিপরীতে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দর বাড়তে পারে বলে বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা।

