ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র অস্থিরতা বিরাজ করছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এক বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে সামরিক হামলার সিদ্ধান্তের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন সৌদি আরবের কার্যত শাসক, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)।
প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ১ মার্চ ২০২৬, সকাল ১১:৪০ মিনিট (IST)। এতে বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে ট্রাম্পকে গত এক মাস ধরে একাধিকবার ব্যক্তিগতভাবে ফোন করেছিলেন এমবিএস—যদিও প্রকাশ্যে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিলেন।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান মিত্র—ইসরায়েল ও সৌদি আরব—দুই দেশই কয়েক সপ্তাহ ধরে ওয়াশিংটনকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছিল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানে মার্কিন হামলার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। অপরদিকে সৌদি যুবরাজ এমবিএস নীরবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান।
প্রতিবেদনে চারজন অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাতে বলা হয়,
“সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান গত এক মাসে একাধিকবার ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে ফোন করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পক্ষে মত দিয়েছেন, যদিও প্রকাশ্যে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছিলেন।”
রোববার ভোরে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বড় ধরনের হামলায় ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন।
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খামেনির মৃত্যুর ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এটি ইরানি জনগণের জন্য তাদের দেশ “ফিরে পাওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ।”
তবে খামেনির মৃত্যু ইরানের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
খামেনি নিহত হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার জবাবে ইরান শনিবার বিভিন্ন মুসলিম প্রতিবেশী দেশে অবস্থিত মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। এর জেরে সৌদি আরবসহ কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ প্রকাশ্যে ইরানের সমালোচনা করে।
সৌদি যুবরাজ এমবিএস ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ শনিবার ফোনে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। ডিসেম্বরের শেষদিকে এক প্রকাশ্য বিরোধের পর এটিই ছিল তাদের প্রথম যোগাযোগ।
আমিরাতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ডব্লিউএএম জানিয়েছে, তারা “অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ বিপজ্জনক উত্তেজনা” নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এমবিএস সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতি “পূর্ণ সংহতি” প্রকাশ করেন এবং প্রয়োজন হলে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন। আমিরাতের প্রেসিডেন্ট এ জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
আরব দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষকদের মতে নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরেই সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলছে। অনেকেই একে “নতুন ঠান্ডা যুদ্ধ” বলে অভিহিত করেন।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল ভূরাজনৈতিক নয়, ধর্মীয় পরিচয়ও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সৌদি আরব নিজেকে সুন্নি মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে দেখে, আর ইরান একটি শিয়া মুসলিম রাষ্ট্র।
২০১৬ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নানা ঘটনার জেরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন ছিল। শিয়া আলেম নিমর আল-নিমরের মৃত্যুদণ্ড এবং ইরানে সৌদি কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলার ঘটনা সম্পর্ককে তলানিতে ঠেলে দেয়।
খামেনির মৃত্যু এবং ইরানে হামলার নেপথ্যে সৌদি লবিংয়ের অভিযোগ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা, ইসরায়েলের অবস্থান এবং সৌদি আরবের কৌশল—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি এখন এক নতুন সমীকরণের মুখে।
ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় আঘাত হানা। কিন্তু এই পদক্ষেপ কি শাসন পরিবর্তনের পথ খুলে দিল, নাকি আরও বড় সংঘাতের সূচনা করল—সেই প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
একটি বিষয় স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্যে যে আগুন জ্বলছে, তার শিখা শুধু তেহরান বা তেলআবিবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা অঞ্চলে, এমনকি বৈশ্বিক রাজনীতিতেও।

