ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এক বিবৃতিতে জানায়, গত শনিবার সকালে তেহরানে নিজ কার্যালয়ে তিনি নিহত হন। তাঁর মৃত্যুতে দেশে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও সাত দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ইরানের বিভিন্ন শহরে মানুষ সড়কে নেমে শোক প্রকাশ করেন। অনেকের হাতে ছিল খামেনির ছবি। অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। সবচেয়ে বড় সমাবেশ হয় তেহরানে। সেখানে ইনকিলাব স্কয়ারে লাখো মানুষ জড়ো হয়ে শোক জানান। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।
হামলা, হতাহত ও পাল্টা আঘাত:
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যৌথ বাহিনীর মধ্যে সংঘাত তীব্র হয়েছে। ইরানের বিভিন্ন শহরে হামলা চালানো হয়। একটি মেয়েদের স্কুলে হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৫।
বিবিসি জানায়, গতকাল এক দিনে ইরানে ৬০টি স্থানে হামলা হয়। এতে কমপক্ষে ৫৭ জন নিহত হয়। পাল্টা হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তিন সেনা সদস্য নিহত এবং পাঁচজন গুরুতর আহত হন।
ইসরায়েলের নয়জন নাগরিক নিহত হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতেও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক বাংলাদেশিসহ তিনজন নিহত এবং ৫৮ জন আহত হয়েছেন। কুয়েতে একজন নিহত ও ৩২ জন আহত হয়েছেন।
হামলার বিবরণ ও নিহত কর্মকর্তারা:
তাসনিম, মেহের ও প্রেস টিভিসহ ইরানের কয়েকটি বার্তা সংস্থা জানায়, ৮৬ বছর বয়সী খামেনি যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন। তাঁকে ‘শহীদ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, খামেনি তাঁর কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেখানে শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। হামলায় তাঁর মেয়ে, জামাতা ও নাতিসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন।
বিবিসির বরাতে জানা যায়, মোট ৪০ জন ইরানি কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, নিহতের সংখ্যা ৪৮।
আনাদোলু এজেন্সি জানায়, খামেনির এক নাতনিও নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আব্দোরহিম মুসাভি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং বিপ্লবী গার্ডের প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর।
হামলার পর খামেনির কার্যালয় ও আশপাশের এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এটি ইরানের নেতৃত্বের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক অবস্থান:
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই হত্যাকাণ্ডকে ‘মহা অপরাধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
আলজাজিরা জানায়, রাজধানী তেহরানে বোমা হামলার মধ্যেও মানুষ রাস্তায় নেমে আসে এবং প্রতিবাদ চালিয়ে যায়।
এর আগে হামলার পরপরই ট্রাম্প দাবি করেন, খামেনি নিহত হয়েছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, খামেনি ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ব্যক্তিদের একজন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, সর্বোচ্চ নেতা আর নেই বলে অনেক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের হাজারো লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ঘোষণা দেন।
দ্য গার্ডিয়ান জানায়, তেহরানে শোক সমাবেশে মানুষ কালো পোশাক পরে অংশ নেয়। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে পাকিস্তান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হয়েছে।
এদিকে মার্কিন গণমাধ্যম আটলান্টিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের বর্তমান নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
বিশ্বশক্তির প্রতিক্রিয়া:
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন খামেনির মৃত্যুতে সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি এই ঘটনাকে ‘নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে।
চীন এই হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার নীরব থাকলেও বিরোধী দল কংগ্রেস এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে।
ইরানের ভেতরে প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব:
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী আইআরজিসি জানিয়েছে, খামেনির হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে নতুন নেতা নির্বাচনের জন্য তিন সদস্যের অন্তর্বর্তী কাউন্সিল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
১৯৮৯ সাল থেকে খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ইরান খামেনির পথেই এগোবে। এক থেকে দুই দিনের মধ্যে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হতে পারে।
উত্তেজনা, হুঁশিয়ারি ও সম্ভাব্য সংঘাত:
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল লাল রেখা অতিক্রম করেছে এবং এর ফল ভোগ করতে হবে।
অন্যদিকে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান পাল্টা হামলা চালালে তার জবাব হবে আরও কঠোর।
ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ১৮টি প্রদেশে হামলা চালিয়েছে। লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বিভিন্ন সরকারি ও সামরিক স্থাপনা। দুটি স্কুলেও হামলা হয়েছে, যেখানে শতাধিক শিশু নিহত হয়েছে।
সংঘাত কোন দিকে যাচ্ছে;
ভারতের লেখক ও বিশ্লেষক এমজে আকবর মনে করেন, এই সংঘাত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এটি অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক দিকে যেতে পারে।
তার মতে, খামেনির হত্যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানকে আরও শক্তিশালী করে ফেলেছে। কারণ, তিনি এখন ইরানিদের কাছে প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
তিনি বলেন, ইরান ভেনেজুয়েলার মতো নয়। দেশটির জনগণ জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় আদর্শে দৃঢ়। এই হামলাকে তারা আগ্রাসন হিসেবে দেখছে। ফলে এটি ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোকে নতুন শক্তি দিতে পারে।
খামেনির উত্থান:
১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া খামেনি ধর্মীয় পরিবারে বড় হন। অল্প বয়স থেকেই ধর্মীয় শিক্ষায় যুক্ত হন।
তিনি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি-এর ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন এবং দীর্ঘ সময় দেশ পরিচালনা করেন।
নতুন নেতৃত্বের দৌড়:
খামেনির মৃত্যুর পর অন্তর্বর্তী কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। এতে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেইন মোহসেনি-এজেই এবং আয়াতুল্লাহ আলি রেজা আরাফি।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞ পরিষদ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন মোজতবা খামেনি, আলি রেজা আরাফি, মোহাম্মদ মাহদি মিরবাগেরি, হাসান খোমেনি এবং মোহসেনি-এজেই।

