মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনার মধ্যেই কুয়েতের আকাশসীমায় ইরানের মিসাইলের আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘এফ-১৫’ ফাইটার জেট বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সোমবার (২ মার্চ) দুপুর ১২টা নাগাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় থাকা যুদ্ধবিমানটি হঠাৎ আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে আছড়ে পড়ছে।
ভিডিও ফুটেজে অন্তত একজন পাইলটকে প্যারাসুট ব্যবহার করে নিরাপদে ইজেক্ট করতে দেখা গেছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ, ক্ষয়ক্ষতি বা পাইলটদের অবস্থা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
এই ঘটনাকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও ঘনীভূত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি সামরিক দুর্ঘটনা নয়—বরং বড় ধরনের সংঘাতের পূর্বাভাসও হতে পারে।
এই ঘটনার মধ্যেই ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের আলোচনার সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো সংলাপে বসবে না তেহরান।
তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনের জবাব হিসেবে এসেছে। ওইসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। লারিজানি এসব দাবিকে “ভিত্তিহীন” বলে উড়িয়ে দেন।
লারিজানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করে বলেন, তার ‘মিথ্যা আশ্বাস’ মধ্যপ্রাচ্যকে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসন নিজ দেশের সেনাদের সম্ভাব্য ব্যাপক হতাহতের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব রূপ এখন ‘ইসরায়েল ফার্স্ট’-এ পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলের আঞ্চলিক কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র তার সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কুয়েতে মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা এবং ইরানের অনমনীয় অবস্থান—দুই মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন মোড় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জবাবে সরাসরি ও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ইতোমধ্যে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে দীর্ঘদিনের ‘ছায়াযুদ্ধ’ সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে। এতে করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বর্তমানে কুয়েত ও আশপাশের আকাশসীমায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। সামরিক ঘাঁটিগুলোতে সতর্কতা জারি রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে একটি বিষয় পরিষ্কার—মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এখন আর সীমিত পরিসরে নেই। একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা বৃহত্তর কৌশলগত দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই উত্তেজনা কি কূটনৈতিক পথে থামবে, নাকি সরাসরি যুদ্ধের দিকে গড়াবে?
একদিকে ইরানের কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া—দুইয়ের সংঘর্ষ মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। সামান্য ভুল হিসাবই বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে আগুন জ্বলেছে, তার শিখা কত দূর ছড়াবে—সেটিই এখন বিশ্বরাজনীতির বড় প্রশ্ন।

