যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে একের পর এক মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে ইরান। পাল্টাপাল্টি আঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এর মধ্যেই বড় প্রশ্ন—ইরানের হাতে এখনো কী ধরনের সামরিক সক্ষমতা রয়েছে? তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভান্ডার কতটা কার্যকর?
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে ইরানের বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বিষয়টি।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার ইরানের। যদিও অনেক প্রযুক্তি তুলনামূলক পুরোনো, তবুও ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা এবং পাল্লার দিক থেকে তেহরান উল্লেখযোগ্য শক্তিধর।
ইরানের হাতে এমন ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা কয়েকশ কিলোমিটার থেকে শুরু করে দুই হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
ইরানের হাতে ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার পাল্লার একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে ‘জুলফিকার’, ‘কিয়াম-১’ এবং ‘শাহাব-১/২’ উল্লেখযোগ্য।
২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যার পর ইরাকের আইন আল-আসাদ মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায় ইরান এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে এসব ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে বলে দাবি করা হয়।
স্বল্পপাল্লার এসব অস্ত্র দ্রুত মোতায়েনযোগ্য এবং সীমান্তবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে তাৎক্ষণিক আঘাত হানার জন্য উপযোগী।
ইরানের ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। ‘শাহাব-৩’, ‘ইমাদ’, ‘গদর-১’, ‘খোররামশহর’ এবং ‘সেজ্জিল’ এ তালিকায় রয়েছে।
এসব ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েল ছাড়াও কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে সক্ষম। বিশেষ করে সলিড ফুয়েলচালিত ‘সেজ্জিল’ দ্রুত উৎক্ষেপণের জন্য উপযোগী হওয়ায় এটি ইরানের কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইরানের অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে ‘সুমার’, ‘ইয়া-আলি’, ‘কুদস’, ‘পাভেহ’ এবং ‘রাদ’-এর মতো ক্রুজ মিসাইল। আড়াই হাজার কিলোমিটার পাল্লার ‘সুমার’ মাটির খুব কাছ দিয়ে উড়ে গিয়ে রাডার এড়িয়ে চলতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন প্রযুক্তি। ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন পাঠিয়ে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রেখে পরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো ইরানের পরিচিত কৌশল।
এই ‘ড্রোন-স্যাচুরেশন’ পদ্ধতি আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর বলে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরান দাবি করেছে, তাদের হাতে ‘ফাত্তাহ’ সিরিজের হাইপারসনিক মিসাইল রয়েছে, যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে উড়ে গিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম।
এ ছাড়া জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, নেভাল মাইন ও সশস্ত্র ড্রোনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাঙ্কার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার সক্ষমতাও রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হওয়ায় হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
ইরান বছরের পর বছর ধরে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ ও বাঙ্কার নির্মাণ করে বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার গড়ে তুলেছে। এসব ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ‘মিসাইল সিটি’ নামে পরিচিত।
এই সুরক্ষিত স্থাপনাগুলো থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা সম্ভব, এমনকি ওপর থেকে হামলা হলেও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকাশ হামলার মুখেও ইরান যাতে পাল্টা আঘাত চালিয়ে যেতে পারে—সেই লক্ষ্যেই এই অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা শুধু সংখ্যায় নয়, কৌশলগত ব্যবহারে নির্ভর করছে। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ভূগর্ভস্থ ঘাঁটির সমন্বিত ব্যবহার তেহরানকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে টিকে থাকার সুযোগ দিতে পারে।
তবে পাল্টা আঘাতের মাত্রা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করবে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে সংঘাতের ছায়া ঘনিয়েছে, তা কত দূর বিস্তৃত হবে—সেই প্রশ্ন এখন বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।

