ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহরে শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি আকস্মিক সামরিক হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। যৌথ এই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, খামেনিকে লক্ষ্য করে চালানো হামলাটি গভীর রাতে নয়, বরং সকালে পরিচালিত হয়। সাধারণত এ ধরনের আঘাত রাতের অন্ধকারে করা হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
দীর্ঘ সময় ধরে এমন একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিল দুই দেশ, যখন ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব একত্রে অবস্থান করবেন। সেই সূত্রে তারা জানতে পারে, শনিবার সকালে তেহরানের মধ্যাঞ্চলের একটি কম্পাউন্ডে বৈঠকে থাকবেন খামেনি। একই সময় সেখানে জ্যেষ্ঠ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উপস্থিতির তথ্যও তাদের হাতে আসে।
মাসের পর মাস খামেনির দৈনন্দিন রুটিন ও চলাচলের ওপর নজর রাখা হয়েছিল। কীভাবে এই নজরদারি চালানো হয়েছে তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ইঙ্গিত দেন যে, খামেনি তাদের উন্নত গোয়েন্দা ও নজরদারি সক্ষমতা এড়িয়ে যেতে পারেননি।
খামেনি সম্পর্কিত তথ্য মানবসূত্র থেকেও আসতে পারে বলে ধারণা রয়েছে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের গতিবিধি বিশ্লেষণ করেই তথ্য পাওয়া গেছে— এমন সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। পরে সেই তথ্য ইসরায়েলের কাছে পাঠানো হয় এবং যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
গত বছরের জুনে সংঘটিত বারো দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছিল ইসরায়েল। তখন ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্তে টেলিযোগাযোগ ও মোবাইল ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের কৌশল ব্যবহারের খবর পাওয়া যায়। দেহরক্ষীদের গতিবিধিও নজরে রাখা হয়েছিল।
দীর্ঘমেয়াদি এ ধরনের নজরদারিতে একজন ব্যক্তির দৈনন্দিন রুটিনের একটি ধারাবাহিক চিত্র তৈরি হয়। এর মাধ্যমে নিয়মিত কর্মকাণ্ড বোঝা যায় এবং সম্ভাব্য দুর্বল মুহূর্ত শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
তেহরান জানত যে তাদের সর্বোচ্চ নেতা শত্রুপক্ষের নজরে আছেন। তারপরও জুনের পর থেকে ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় ব্যর্থ হওয়া ইরানের নিরাপত্তা ও প্রতিগোয়েন্দা ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সক্ষমতারও প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ তারা নজরদারির কৌশল নিয়মিত পরিবর্তন করেছে।
ধারণা করা হচ্ছে, দিনের আলোয় হামলার সম্ভাবনা কম ধরে নিয়েছিল ইরান। সেই হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
অভিযানে দায়িত্ব ভাগ করা হয়েছিল। ইসরায়েল মূলত ইরানি নেতাদের লক্ষ্য করে আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্র মনোযোগ দেয় সামরিক স্থাপনায়। প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জেট যুদ্ধবিমান থেকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়।

তেহরান পৌঁছাতে ইসরায়েলি জেটগুলোর আনুমানিক দুই ঘণ্টা সময় লাগে। তবে তারা কত দূর থেকে গোলাবারুদ নিক্ষেপ করেছে তা স্পষ্ট নয়। স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর খামেনির কম্পাউন্ডে একে একে ৩০টি বোমা ফেলা হয়।
ধারণা করা হয়, সে সময় খামেনি কম্পাউন্ডের নিচে একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে অবস্থান করছিলেন। নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে গভীরে প্রবেশক্ষম গোলাবারুদের প্রয়োজন হয়। এজন্য একাধিক বোমা ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
একই সময়ে তেহরানের অন্য স্থানেও হামলা হয়। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কার্যালয়ও ছিল। পরে তিনি বিবৃতিতে জানান, তিনি নিরাপদ আছেন।
ইরান নিশ্চিত করেছে, তিনজন জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। তারা হলেন ডিফেন্স কাউন্সিল সেক্রেটারি আলি শামখানি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ নাসিরজাদেহ এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল মুহাম্মদ পাকপৌর।
হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মার-এ-লাগোতে স্থানীয় সময় ছিল মধ্যরাত। সেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগেছে।

